ফুটবল ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন। এই প্রথম ফিফা (আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন) বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে কোপা আমেরিকা ও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের (ইউরো) বর্তমান দুই শিরোপাধারী। মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় নিয়ে এর আগে আলাদা আলাদাভাবে দুই অঞ্চলের চ্যাম্পিয়ন দল মোট আটবার বিশ্বকাপের ফাইনালে লড়লেও, এবারই প্রথম তারা সরাসরি শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে একে অপরের মুখোমুখি হচ্ছে। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় আগামী ২০ জুলাই রাত ১টায় শুরু হবে বিশ্ব ফুটবলের এই মহারণ।
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড প্রথম গড়েছিল তৎকালীন পশ্চিম জার্মানি। পরবর্তীতে ২০১০ সালে স্পেন এবং ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা সেই কীর্তি স্পর্শ করে। তবে কোপা আমেরিকা ও ইউরো চ্যাম্পিয়নদের ট্রফি জয়ের পথটি সব সময় মসৃণ ছিল না।
লাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে ১৯৩০ সালে বিশ্বকাপের প্রথম আসরেই ফাইনালে উঠেছিল আর্জেন্টিনা। তবে উরুগুয়ের কাছে ৪-২ ব্যবধানে হেরে রানার্স-আপ (দ্বিতীয় স্থান) হতে হয় তাদের। এরপর ১৯৯৮ সালের ফাইনালে কোপা বিজয়ী হিসেবে খেলতে নেমে ফ্রান্সের কাছে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত হয় ব্রাজিল। তবে ২০২২ সালে সেই গেরো ভাঙতে সক্ষম হয় আর্জেন্টিনা। ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয়ী দলটি কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে (পেনাল্টি শুটআউট বা ভাগ্য নির্ধারণী শট) হারিয়ে বিশ্বসেরার মুকুট পরে। এর আগে ১৯৫০ সালের আসরে ঘরের মাঠে উরুগুয়ের কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল আগের বছরের কোপা জয়ী ব্রাজিলের।
ইউরোপীয় অঞ্চলের চ্যাম্পিয়নদের ক্ষেত্রেও পরিসংখ্যানটি বেশ রোমাঞ্চকর। ১৯৬০ সালে ইউরো শুরুর পর ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে প্রথম মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ফাইনালে পা রাখে ইতালি। তবে ব্রাজিলের কাছে ৪-১ গোলে হেরে যায় তারা। এর চার বছর পর, ১৯৭২ সালের ইউরো জয়ী পশ্চিম জার্মানি ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে দ্বিমুকুট পরার গৌরব অর্জন করে। তবে ১৯৮২ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ফাইনালে উঠলেও ইতালির কাছে ৩-১ গোলে হারতে হয় তাদের। পরবর্তীতে ২০০৮ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন ২০১০ সালের বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসকে ১-০ গোলে হারিয়ে ঐতিহাসিক ট্রফি জয় করে।
মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়নদের বিশ্বকাপ ভাগ্য সবসময় ভালো যায় না। ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয়েও বাছাইপর্বের বৈতরণী পার হতে না পেরে কাতার বিশ্বকাপে খেলার সুযোগই পায়নি চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি। একই ভাগ্য বরণ করতে হয়েছিল ১৯৭৮ সালে চেকোস্লোভাকিয়া, ১৯৯৪ সালে ডেনমার্ক এবং ২০০৬ সালে গ্রিসকে। কোপা আমেরিকার চ্যাম্পিয়নদের মধ্যেও এমন নজির রয়েছে। ১৯৩৭ সালের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা পরের বছরের বিশ্বকাপ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। এ ছাড়া প্যারাগুয়ে (১৯৫৪ ও ১৯৮২), বলিভিয়া (১৯৬৬), কলম্বিয়া (২০০২) এবং চিলি (২০১৮) মহাদেশ সেরা হয়েও বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।
সব মিলিয়ে অতীত পরিসংখ্যান ও রোমাঞ্চকর ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনালটি এক অনন্য মাত্রা পেয়েছে। স্পেন ও আর্জেন্টিনার এই মহারণ ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দেবে, তা বলাই বাহুল্য।