ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্য রচনা করল পিরামিডের দেশ মিশর। সরাসরি বিদায় পর্বের (নকআউট) শেষ ৩২ দলের রোমাঞ্চকর ম্যাচে সাবেক চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে পেনাল্টি ভাগ্য নির্ধারণী পর্বে (টাইব্রেকার) ৪-২ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো শেষ ষোলোর (১৬ দলের পর্ব) টিকিট নিশ্চিত করেছে তারা। তবে ঐতিহাসিক এই জয়ের পর মাঠের সীমারেখা পেরিয়ে এক গভীর আবেগঘন ও মানবিক মুহূর্তের জন্ম দিয়েছেন মিশরের প্রধান প্রশিক্ষক (কোচ) হোসাম হাসান। অদম্য এই জয়টি তিনি ফিলিস্তিনের নিপীড়িত ও অবরুদ্ধ জনগণের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ডালাস ক্রীড়াঙ্গনে (স্টেডিয়াম) অনুষ্ঠিত ম্যাচটি নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে ১-১ গোলে সমতায় শেষ হয়। খেলার শুরুতেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে ম্যাচের ১৩তম মিনিটে ইমাম আশুরের চমৎকার মাথা দিয়ে করা আঘাতে (হেড) এগিয়ে যায় মিশর। তবে ম্যাচের ৫৫তম মিনিটে মোহামেদ হানির একটি দুর্ভাগ্যজনক আত্মঘাতী গোল অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচে সমতায় ফেরায়। এরপর অতিরিক্ত সময়েও কোনো দল গোল করতে না পারায় ম্যাচটি পেনাল্টি ভাগ্য নির্ধারণী পর্বে গড়ায়। সেখানে অস্ট্রেলিয়ার হ্যারি সুটার এবং লুকাস হ্যারিংটন গোল করতে ব্যর্থ হলে, হোসাম আবদেলমাজিদের নিখুঁত জয়সূচক শটে ইতিহাস গড়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে লাল-সাদা-কালোরা।
জয় নিশ্চিত হতেই মাঠের ভেতর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মিশরের প্রধান কোচ হোসাম হাসান। তিনি নিজের দেশের পতাকার পাশাপাশি ফিলিস্তিনের জাতীয় পতাকাও উঁচিয়ে ধরেন। একই সময়ে পুরো মিশরীয় ফুটবল দল মাঠের সবুজ ঘাসের ওপর সেজদায় লুটিয়ে পড়ে (মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে প্রার্থনা) মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে হোসাম হাসান বলেন, "মহান আল্লাহ ফিলিস্তিনের জনগণকে বিজয় দান করুন এবং তাঁদের শহীদদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। আমি আমাদের এই ঐতিহাসিক জয়টি মিশরের আপামর জনতা এবং আমাদের ভাই—ফিলিস্তিনের সেই দয়ালু ও সম্মানিত মানুষের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করছি।"
মিশরের এই অভাবনীয় জয়ের খবর ছড়িয়ে পড়তেই গাজা উপত্যকাসহ পুরো আরব বিশ্বে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার অস্থায়ী তাঁবু ও ধ্বংসস্তূপের মাঝে বসানো বড় পর্দায় ম্যাচটি উপভোগ করেন হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, গাজার শিশুরা গালে মিশরের পতাকা এঁকে এবং বড়রা কোলাকুলি করে এই ঐতিহাসিক জয় উদযাপন করছেন।
গাজার বাসিন্দা তামের নাভেদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে লিখেছেন, "চারপাশের এত কষ্টের মাঝেও মিশরের এই জয় আমাদের ধ্বংসাবশেষের নিচে থাকা তাঁবুতে ক্ষণিকের জন্য হলেও হাসির জোয়ার এনে দিয়েছে।"
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর হাইভোল্টেজ ম্যাচে হোসাম হাসানের অপরাজিত মিশর দল এবার মুখোমুখি হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা অথবা কেপ ভার্দের।