রাজনৈতিক সমঝোতা ও সংসদীয় শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে ছলচাতুরীর মাধ্যমে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল-২০২৬’ পাস করার অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীদলীয় প্রধান সচেতক (চিফ হুইপ) নাহিদ ইসলাম। শুক্রবার জাতীয় সংসদে বিলটি পাসের পর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি সরকারের এই পদক্ষেপকে ‘রাজনৈতিক জোচ্চুরি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
জাতীয় সংসদে শুক্রবার এক উত্তপ্ত বিতর্ক ও বিরোধী দলের তীব্র আপত্তির মুখে পাস হয়েছে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর বিল-২০২৬’। তবে এই বিল পাসের প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় প্রধান সচেতক নাহিদ ইসলাম। তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে যে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছিল, সরকার তা একতরফাভাবে ভঙ্গ করেছে।
নাহিদ ইসলাম তার বক্তৃতায় জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নেওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টির বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছিল যে, এগুলোতে কোনো ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই সংসদে বিল আকারে পাস করা হবে। বিরোধী দল এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেও সরকার শেষ মুহূর্তে রহস্যজনকভাবে স্মৃতি জাদুঘর বিলে সংশোধনী এনেছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যদি নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা (সংসদে অধিক আসন থাকা) আছে বলেই যা খুশি তা-ই করতে হয়, তবে বিশেষ কমিটির কোনো প্রয়োজন ছিল না। এটি স্রেফ একটি রাজনৈতিক প্রতারণা।”
বিলের একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নিয়ে বিশেষ আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় এই নেতা। নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, জাদুঘর পরিচালনা পর্ষদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী। আগে যেখানে একজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞকে এই পদে রাখার বিধান ছিল, সেখানে রাজনৈতিক ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করাকে ‘দলীয়করণের ধারাবাহিকতা’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে শুরু করে ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড পর্যন্ত সবখানে যেভাবে দলীয় প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে, এখন জুলাই বিপ্লবের স্মৃতিবিজড়িত এই প্রতিষ্ঠানকেও সেই একই ছাঁচে ফেলার চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, এই জাদুঘরটি গত দেড় দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব পক্ষের আত্মত্যাগের স্মারক। কিন্তু সরকার এখন আইনি ক্ষমতার মাধ্যমে যাকে ইচ্ছা বাদ দেওয়ার পথ প্রশস্ত করছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটি একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বাধীন থাকা উচিত ছিল বলে তিনি মনে করেন।
বিরোধী দলের এই তীব্র প্রতিবাদের মুখেও সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বিলটি উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। নাহিদ ইসলাম সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি সরকার আগের সমঝোতা অনুযায়ী এই বিল পুনরায় বিবেচনা না করে, তবে সংসদীয় কার্যক্রমে বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণের আর কোনো সার্থকতা থাকবে না।
একটি দেশের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভ বা জাদুঘর যখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, তখন তার নিরপেক্ষতা ও সর্বজনীনতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল একটি জাতীয় ঐক্য ও সংগ্রামের প্রতীক; একে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা সরকারের ফ্রেমে বন্দি করার চেষ্টা ইতিহাসের সত্যকে সংকুচিত করতে পারে। সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিদ্যমান আস্থার সংকট কাটিয়ে এই বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করা সময়ের দাবি।