সর্বোচ্চ কর দিয়েও উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত নারায়ণগঞ্জের মানুষ। প্রভাবশালী মহলের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড আর সন্ত্রাসের কবলে পড়ে থমকে গেছে জনগুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রকল্প। বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে জেলার এই করুণ দশা তুলে ধরে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন।
শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নগরী নারায়ণগঞ্জ থেকে দেশের সর্বোচ্চ রাজস্ব বা কর আদায় হলেও জেলার অবকাঠামো ও নাগরিক সেবা এখনো শোচনীয় অবস্থায় রয়ে গেছে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন গতকাল বুধবার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এই বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরেন। অধিবেশনে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, এলাকার প্রভাবশালী বা 'গডফাদার' এবং সন্ত্রাসীদের বাধায় বিগত বছরগুলোতে জনগণের উপকারে আসে এমন কোনো কাজই সঠিকভাবে করা সম্ভব হয়নি।
সাংসদ আব্দুল্লাহ তাঁর বক্তব্যে নারায়ণগঞ্জকে একটি 'অবহেলিত জনপদ' হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, উন্নয়নের চেয়ে নারায়ণগঞ্জ এখন সন্ত্রাস আর নেতিবাচক ব্র্যান্ডিং বা পরিচয়ের জন্য বেশি পরিচিতি পেয়েছে। এর ফলে জেলার অনেক ইতিবাচক সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, অনেক কষ্ট করে অনুমোদিত হওয়া বা নির্মিত হওয়া সরকারি অবকাঠামো যেমন—হাসপাতাল, স্টেডিয়াম এবং বড় বড় ভবনগুলো অবৈধ দখলে চলে গেছে কিংবা সেগুলোর কার্যকারিতা নষ্ট করা হয়েছে। গডফাদারদের আধিপত্যের কারণে এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষের সেবায় ব্যবহৃত হওয়ার বদলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
সংসদ অধিবেশনে শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে নজর দিয়ে তিনি শিক্ষামন্ত্রীর উদ্দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তিনি জানতে চান, ২০২৩ সালে নারায়ণগঞ্জে যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, সেই স্বপ্নের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো বিশেষ উদ্যোগ নেবে কি না। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় স্থানীয় ছাত্রসমাজ ও অভিভাবকদের মধ্যে যে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে, সেটিও তিনি সংসদে তুলে ধরেন।
সাংসদ আব্দুল্লাহ আল আমিন মনে করেন, নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রাপ্য মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে হলে আগে এই সন্ত্রাসী ও গডফাদার প্রথা নির্মূল করতে হবে। জেলার উন্নয়নে অনুমোদিত মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা এখন সময়ের দাবি। দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখা এই জনপদের মানুষকে উন্নয়নের সুফল থেকে দূরে রাখা প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের উন্নয়নকেই বাধাগ্রস্ত করা বলে তিনি অভিমত দেন।
একটি শহর যখন দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখে, তখন তার নাগরিক সেবা ও শিক্ষা খাতের উন্নয়ন পিছিয়ে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় প্রভাবশালী মহলের বাধার মুখে উন্নয়ন কাজ থমকে যাওয়া আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতাই প্রকাশ করে। সরকার যদি সত্যিই নারায়ণগঞ্জের পজিটিভ ব্র্যান্ডিং করতে চায়, তবে গডফাদার প্রথা উপড়ে ফেলে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের মতো প্রকল্পগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষ এখন আশ্বাসের চেয়ে বড় বড় দালান আর মানসম্মত সেবার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায়।