অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫’ অনুমোদন না কি বাতিল—এই প্রশ্নে জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। বুধবার সংসদীয় বিশেষ কমিটির বৈঠকে জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কারের রূপরেখা) বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সদস্যদের মধ্যে যুক্তিতর্ক আর পাল্টাপাল্টি দাবির ঘটনা ঘটেছে।
সংসদ প্রতিবেদক
জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে আয়োজিত গণভোটের আইনি ভিত্তি বা ‘গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫’ এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করতে গঠিত বিশেষ কমিটির বৈঠকে এই অস্থিরতা প্রকাশ পায়। ১৪ সদস্যের এই কমিটিতে ১১ জন সরকারি দল বিএনপির এবং ৩ জন বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সদস্য।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, কমিটির সদস্যরা ১১৩টি অধ্যাদেশ পাসে একমত হলেও গণভোটসহ গুরুত্বপূর্ণ ২০টি অধ্যাদেশ নিয়ে এখনো কোনো রফাদফা হয়নি। জামায়াতের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন বিএনপি এই অধ্যাদেশটি বাতিলের প্রস্তাব করেছে। দলটির সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান জানান, আইন মন্ত্রণালয় থেকে গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাব আসায় তারা তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। জামায়াতের দাবি, দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করেছেন, তাই এটি বাতিল করা জনগণের রায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
অন্যদিকে, কমিটির সভাপতি ও বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তারা বাতিল বা রাখার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। বরং সংবিধানের আলোকে বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা মনে করেন। আগামী ২৯ মার্চ কমিটির পরবর্তী বৈঠকে এ নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ বিতর্ক কেবল গণভোটেই সীমাবদ্ধ নেই। জামায়াতে ইসলামীর দাবি, বিএনপি সরকার গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মানবাধিকার কমিশন এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলোতেও ব্যাপক পরিবর্তন আনতে চাইছে। বিরোধী দলের অভিযোগ, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকার আবারও প্রধানমন্ত্রীর হাতে একচ্ছত্র ক্ষমতা ফিরিয়ে নিতে চায়, যা জুলাই সনদের মূল চেতনার পরিপন্থী।
বিশেষ করে বিচারক নিয়োগ এবং দুদকের চেয়ারম্যান নিয়োগে সার্চ কমিটির (অনুসন্ধান কমিটি) ক্ষমতা খর্ব করার প্রস্তাব নিয়ে বিরোধীরা সরব হয়েছে। তাদের মতে, এর ফলে সরকার নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে এসব সাংবিধানিক পদে বসানোর সুযোগ পাবে।
জুলাই সনদ বনাম বর্তমান বাস্তবতা উল্লেখ্য, গত ২৫ নভেম্বর জারি করা এই অধ্যাদেশের অধীনে ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আদেশে বলা হয়েছিল, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে যা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী কাঠামো তৈরি করবে। কিন্তু নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি এখন এই পরিষদের বদলে সংসদের মাধ্যমেই সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে আগ্রহী।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান অবশ্য দাবি করেছেন, সরকার এখনো জুলাই সনদের বাইরে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তবে তিনি এ-ও উল্লেখ করেন যে, গণভোটের মাধ্যমে পরিষদ গঠন বিষয়টি জুলাই সনদের কোনো কোনো অংশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধ্যাদেশগুলো আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে সংসদে পাস না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। ফলে হাতে থাকা এই অল্প সময়ের মধ্যে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে ঐকমত্য হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
গণভোটের মাধ্যমে যে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছিল, তা আইনি মারপ্যাঁচে আটকা পড়া গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের। একটি বিপ্লব পরবর্তী রাষ্ট্রে সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনড় অবস্থান দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেন জুলাই বিপ্লবের মূল দাবিগুলোকে আড়াল না করে, সেদিকে সজাগ থাকাই হবে সময়ের দাবি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি আর জনমতের রায়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।