জাতীয় সংসদে রাজনৈতিক সমঝোতা ও ঐকমত্য ভঙ্গ করে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল-২০২৬’ পাসের অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি দাবি করেছেন, সরকার পক্ষ আলোচনার ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে জোচ্চুরির মাধ্যমে এই বিলটি পাস করে নিয়েছে।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে বিলটি পাসের পর আলোচনায় অংশ নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টির বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দল একমত হয়েছিল যে, এগুলো কোনো পরিবর্তন ছাড়াই সংসদে আইন হিসেবে পাস হবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সরকার সেই সমঝোতা ভেঙে বিলে নতুন সংশোধনী যুক্ত করেছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, “আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে ঐকমত্য হওয়া বিলগুলোতে কোনো প্রশ্ন তুলব না। কিন্তু সরকার পক্ষ আজ আমাদের সামনে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত কাজ করল। সংখ্যাতত্ত্বের জোরে যদি যা খুশি তাই করতে হয়, তবে আলোচনার জন্য বিশেষ কমিটি গঠনের কোনো প্রয়োজন ছিল না।”
বিলের প্রধান পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি বলেন, জাদুঘর পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে আগে একজন বিশেষজ্ঞকে রাখার বিধান ছিল। কিন্তু সংশোধনী এনে এখন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে সভাপতি করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নাহিদ ইসলাম বিষয়টিকে ‘দলীয়করণের ধারাবাহিকতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে ক্রিকেট বোর্ড—সবকিছুই এখন দলীয়করণের কবলে। এখন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরকেও সেই একই পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
নাহিদ ইসলাম আরও উল্লেখ করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর কোনো সাধারণ শাখা জাদুঘর নয়; এটি একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। এখানে বিশেষজ্ঞের বদলে মন্ত্রীকে বসানো দীর্ঘদিনের রেওয়াজ ভঙ্গের শামিল। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই জাদুঘরটি বিগত ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনবিরোধী লড়াই এবং জুলাই বিপ্লবের সব পক্ষের অংশীদারিত্বের স্মারক। সরকার এখন সংশোধনী এনে যে কাউকে বাদ দেওয়ার ক্ষমতা নিজের হাতে রাখছে, যা মূলত গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনার পরিপন্থি।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, যদি এই সংশোধনী বাতিল করে আগের ঐকমত্য অনুযায়ী বিলটি পুনরায় বিবেচনা করা না হয়, তবে সংসদীয় কার্যক্রমে বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণের আর কোনো গুরুত্ব থাকবে না। উল্লেখ্য, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বিলটি উত্থাপন করলে বিরোধী দলের প্রবল বিরোধিতার মাঝেই তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মতো একটি জাতীয় আবেগ ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি ছিল। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা প্রতিষ্ঠানে বিশেষজ্ঞের পরিবর্তে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা মন্ত্রীদের প্রধান করার প্রবণতা আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোর পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যদি স্মৃতি জাদুঘরকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা না যায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জুলাই বিপ্লবের নিরপেক্ষ ইতিহাস তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। সরকারের উচিত হবে বিরোধী দলের অভিযোগ গুরুত্বের সাথে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে পুনরায় আলাপ-আলোচনার পথ প্রশস্ত করা।