মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে জয়ের একদম দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। জয়ের জন্য যখন দরকার মাত্র একটি উইকেট, ঠিক তখনই মুষলধারে বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে খেলা। তবে বৃষ্টিতে বল আর মাঠে না গড়ালেও, বৃষ্টি আইনে বিশাল জয় নিশ্চিত হতে চলেছে স্বাগতিকদের।
দীর্ঘ চার বছর পর জাতীয় দলে ফিরেছেন অলরাউন্ডার মোসাদ্দেক হোসেন। প্রত্যাবর্তনের এই মঞ্চটাকে তিনি যেন নিজের করে নিয়েছেন। ব্যাট হাতে অপরাজিত অসাধারণ এক ইনিংস খেলার পর বল হাতেও দেখিয়েছেন ভেলকি। তার সঙ্গে তরুণ পেসার নাহিদ রানার গতির ঝড়ে মিরপুরে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে রীতিমতো কোণঠাসা করে ফেলেছে বাংলাদেশ। জেলি-মাখানো অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটিং লাইনআপ বাংলাদেশের বোলারদের সামনে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।
মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ২৮৬ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বৃষ্টির আগপর্যন্ত ৪২ ওভার ২ বলে ৯ উইকেট হারিয়ে ১৯১ রান তুলেছে সফরকারী অস্ট্রেলিয়া। জয়ের জন্য শেষ ৪৬ বলে তাদের প্রয়োজন আরও ৯৪ রান, অন্যদিকে স্বাগতিকদের দরকার মাত্র ১টি উইকেট। তবে বৃষ্টিতে যদি আর একটি বলও মাঠে না গড়ায়, তাতেও আক্ষেপের কিছু নেই বাংলাদেশের। কারণ বৃষ্টি আইনে (ডাকওয়ার্থ-লুইস বা ডিএলএস পদ্ধতি) এই মুহূর্তে পরিষ্কার ব্যবধানে এগিয়ে আছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। নিয়ম অনুযায়ী, ৪২ ওভার ২ বলে অস্ট্রেলিয়ার রান থাকার কথা ছিল কমপক্ষে ২৬০। অর্থাৎ, খেলা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলে বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশ জয় পাবে ৮৬ রানের বিশাল ব্যবধানে।
এর আগে বাংলাদেশের দেওয়া লক্ষ্য রক্ষা করতে নেমে শুরু থেকেই অজিদের চেপে ধরে টাইগার বোলাররা। ইনিংসের একদম প্রথম বলেই গতি তারকা তাসকিন আহমেদ ভেঙে দেন অস্ট্রেলিয়ান উদ্বোধনী ব্যাটার ম্যাথু শর্টের স্টাম্প। কোনো রান তোলার আগেই প্রথম উইকেট হারিয়ে চরম বিপাকে পড়ে সফরকারীরা। পরের ওভারে বল হাতে জাদু দেখান বাঁহাতি পেসার মোস্তাফিজুর রহমান। তার বলে লেগ বিফোর উইকেটের (এলবিডব্লিউ) ফাঁদে পড়েন মার্নাস লাবুশেন (১ রান)। শুরুতে মাঠের আম্পায়ার আউট না দিলেও ভিডিও প্রযুক্তির (রিভিউ) সাহায্য নিয়ে সফল হয় বাংলাদেশ। মাত্র ২ রানেই ২ উইকেট হারিয়ে মারাত্মক চাপে পড়ে যায় অস্ট্রেলিয়া।
প্রাথমিক সেই ধাক্কা সামলে ওঠার চেষ্টা করছিলেন জশ ইংলিশ। তবে তরুণ গতিতারকা নাহিদ রানার দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে বিভ্রান্ত হন তিনি। রানার গতির মুখে ব্যাট পেতে দিলে বল চলে যায় উইকেটরক্ষক লিটন দাসের গ্লাভসে। ১৯ রান করে বিদায় নেন ইংলিশ।
এরপর বল হাতে চমক দেখান প্রত্যাবর্তনের নায়ক মোসাদ্দেক হোসেন। নিজের দ্বিতীয় ওভারেই তিনি সাজঘরে ফেরান থিতু হওয়া ব্যাটার কপার কনোলিকে (৩৫ রান)। মোসাদ্দেকের ঘূর্ণি বলের লাইন বুঝতে না পেরে সরাসরি বোল্ড হন তিনি। ৯১ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের হাল ধরার চেষ্টা করেন অ্যালেক্স ক্যারে। তবে তাকেও অর্ধশতক ছুঁতে দেননি নাহিদ রানা। ৪৭ রান করা ক্যারে রানার গতিতে পরাস্ত হয়ে উইকেটরক্ষকের হাতে ধরা পড়েন। এরপর ম্যাট রেনশকে (২ রান) এলবিডব্লিউ করে নিজের দ্বিতীয় শিকার তুলে নেন মোসাদ্দেক। নাহিদ রানা টানা দুই ওভারে সফরকারীদের লেজ ছেঁটে দিলে ১৫৬ রানেই ৯ উইকেট হারিয়ে বসে অস্ট্রেলিয়া। একপ্রান্ত আগলে রেখে ক্যামেরন গ্রিন ৬৪ বলে একটি অর্ধশতক তুলে নিয়ে কেবল হারের ব্যবধানই কমাচ্ছিলেন।
এর আগে মঙ্গলবার টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ২৮৪ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। দলের পক্ষে সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটি আসে মোসাদ্দেক হোসেনের ব্যাট থেকে। ৭০ বলে ৮৬ রানের এক দুর্দান্ত অপরাজিত ইনিংস খেলেন তিনি। এছাড়া অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ৬৭ রান এবং তরুণ ওপেনার তানজিদ তামিম ৫৪ রানের চমৎকার দুটি ইনিংস উপহার দেন। শেষ দিকে তাসকিন আহমেদ ১৫ বলে ২০ রানের একটি ঝড়ো ইনিংস খেললে দলের সংগ্রহ বেশ পুষ্ট হয়, যা বোলারদের কাজটা সহজ করে দেয়।
মিরপুরের এই ম্যাচটি কেবল একটি সম্ভাব্য জয় নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য অনেকগুলো ইতিবাচক দিক উন্মোচন করেছে। দীর্ঘদিন পর দলে ফিরে মোসাদ্দেক হোসেনের এমন পরিণত অলরাউন্ড পারফরম্যান্স প্রমাণ করে যে, ঘরোয়া ক্রিকেটে রান করার মূল্যায়ন সবসময়ই মধুর হয় এবং সুযোগ পেলে অভিজ্ঞরা ঠিকই জ্বলে উঠতে পারেন। অন্যদিকে, নাহিদ রানার মতো তরুণ পেসারের আগুনে বোলিং অস্ট্রেলিয়ার মতো পরাক্রমশালী দলের বিপক্ষেও কতটা কার্যকর, তা আরও একবার প্রমাণিত হলো। দলের এই সম্মিলিত ও আগ্রাসী পারফরম্যান্স সামনের ম্যাচগুলোতে খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।