বিশ্বমঞ্চে মরক্কো ফুটবল দলের লড়াকু মানসিকতা এবং মাঠের ভেতরের আবেগঘন মুহূর্তগুলো বরাবরই বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। এবার নেদারল্যান্ডসের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে আরও একবার ফুটবল পরাশক্তিদের চমকে দিল উত্তর আফ্রিকার এই দেশটি। টাইব্রেকারের (পেনাল্টি শুটআউট) স্নায়ুচাপ জয় করে নেদারল্যান্ডসকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিয়েছে মরক্কো। তবে এই জয়ের পর মাঠের ভেতরে ফুটবলারদের গভীর বিশ্বাস ও আনুগত্যের দুটি বিশেষ দৃশ্য এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ের ৩০ মিনিটেও কোনো দল গোল করতে পারেনি। ফলে জয়-পরাজয় নির্ধারণে সাহায্য নিতে হয় পেনাল্টি শুটআউটের। স্নায়ুক্ষয়ী এই টাইব্রেকার শুরুর ঠিক আগে মরক্কোর প্রধান কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে মাঠের মাঝেই মোনাজাত বা প্রার্থনায় অংশ নেন। এরপর চূড়ান্ত শটে জয় নিশ্চিত হতেই মরক্কোর ফুটবলাররা মাঠের সবুজ ঘাসে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে পরম করুণাময়ের প্রতি শুকরিয়া আদায় করেন। ইতালির বিখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক ফ্যাব্রিজিও রোমানোও এই আবেগঘন মুহূর্তের ছবি প্রকাশ করে মরক্কোর খেলোয়াড়দের কৃতজ্ঞতাবোধের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
ম্যাচের মূল লড়াইও ছিল রোমাঞ্চে ঠাসা। আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠা ম্যাচে ৭২ মিনিটে কোডি গাকপোর গোলে লিড (এগিয়ে যাওয়া) পায় নেদারল্যান্ডস। ডাচদের জয় যখন প্রায় সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই অতিরিক্ত সময়ের প্রথম মিনিটে গোল করে মরক্কোকে নাটকীয়ভাবে সমতায় ফেরান ইসসা ডিওপ।
এরপর শুরু হয় পেনাল্টি শুটআউটের পরীক্ষা। নেদারল্যান্ডসের পক্ষে প্রথম শটেই গোল পান কুপমাইনার্স। অন্যদিকে মরক্কোর এল আয়নাউয়ি প্রথম শটে গোল করতে ব্যর্থ হলে ডাচ শিবির স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হতে দেননি ডাচ তারকা জাস্টিন ক্লাইভার্ট, তাঁর নেওয়া দ্বিতীয় শটটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। মরক্কোর রাহিমি নিজের শট জালে জড়িয়ে সমতা আনেন।
তৃতীয় শটে নেদারল্যান্ডসের ভেগহোর্স্ট এবং মরক্কোর শেমসদিন তালবি—উভয়ই গোল করতে সফল হন। তবে চতুর্থ শটে ডাচ মিডফিল্ডার কুইন্টেন টিম্বার্স গোলপোস্টের বাইরে বল মারলে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় মরক্কো। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে মরক্কোর অধিনায়ক আশরাফ হাকিমির নেওয়া শটটি গোলপোস্টে লেগে ফিরে আসে।
ম্যাচের ভাগ্য তখন নির্ধারণী পঞ্চম শটের ওপর। নেদারল্যান্ডসের সামারভিলের নেওয়া শটটি অসাধারণ দক্ষতায় ডান দিকে ঝাঁপিয়ে রক্ষা করেন মরক্কোর অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনো। শেষ শট নিতে এসে কোনো ভুল করেননি মরক্কোর সাইবারি। নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে দলকে ঐতিহাসিক বিজয় এনে দেন তিনি। এই জয়ের মধ্য দিয়ে মরক্কো কেবল শেষ ষোলোতেই জায়গা করে নেয়নি, একই সাথে বিশ্বমঞ্চে অনন্য এক সৌহার্দ্যের বার্তাও পৌঁছে দিয়েছে।