আধুনিক যন্ত্রনির্ভর সভ্যতা আর আকাশ সংস্কৃতির দাপটে দেশের গ্রামীণ জনপদ থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী লোকজ উৎসবগুলো। এক সময় যে উৎসবকে কেন্দ্র করে পুরো গ্রাম আনন্দে মেতে উঠত, বর্তমানে সেখানে জায়গা করে নিয়েছে চার দেয়ালের বন্দি যান্ত্রিক বিনোদন।
আমাদের বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি মূলত কৃষিভিত্তিক। ফসলের ঘ্রাণ আর ঋতু পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে এ দেশে পালিত হতো শত শত উৎসব। কিন্তু সময়ের আবর্তে সেই চিত্র আজ অনেকটাই বিবর্ণ। গ্রামের সাধারণ মানুষের প্রাণের মেলা, বৈশাখী উৎসব, নবান্ন কিংবা পিঠা উৎসবের সেই আগের জৌলুস এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না। মূলত নগরায়ন আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতিরিক্ত আসক্তি তরুণ প্রজন্মকে শেকড় থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
এক সময় গ্রামের বিস্তৃত মাঠে আয়োজন করা হতো হাডুডু, বলিখেলা আর লাঠিখেলা। সেই সাথে বসতো জারি, সারি ও কবিগানের আসর। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের কাছে এসব আজ কেবল বইয়ের পাতার রূপকথা। তথ্য প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এই যুগে কিশোর-তরুণরা মাঠের খেলার চেয়ে মোবাইল স্ক্রিনে গেম খেলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। ফলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে মেলবন্ধন এসব লোকজ উৎসবের মাধ্যমে তৈরি হতো, তা আজ হুমকির মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশ্বায়নের এই যুগে আমরা ক্রমশ পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি। এর ফলে নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি অবজ্ঞা এবং উদাসীনতা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে শহরমুখী মানুষের আধিক্য এবং গ্রামীণ যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাওয়ায় পারিবারিক ঐতিহ্যগুলোর চর্চাও কমে গেছে। বর্তমানের উৎসবগুলো এখন অনেকটাই কৃত্রিম ও লোকদেখানো আড়ম্বরে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রাণের স্পন্দন মেলা ভার।
তবে আশার কথা হলো, দেশের কিছু কিছু প্রান্তে এখনো তরুণরা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বিলুপ্তপ্রায় লোকজ মেলাগুলো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং সঠিক প্রচারণার অভাব তাদের এই যাত্রাকে কঠিন করে তুলছে। জাতীয় পরিচয় ধরে রাখতে হলে এসব বিলুপ্তপ্রায় উৎসবকে আধুনিক যুগের সাথে সামঞ্জস্য রেখে পুনরুজ্জীবিত করা এখন সময়ের দাবি।
সংস্কৃতি একটি জাতির দর্পণ। আমরা যদি আমাদের শেকড়কে ভুলে গিয়ে কেবল যান্ত্রিকতাকে আপন করে নিই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক আত্মপরিচয়হীন সংকটে পড়বে। প্রযুক্তি অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা যেন আমাদের প্রাণের উৎসব আর ঐতিহ্যের বিনিময়ে না হয়। গ্রামের উৎসবগুলো কেবল আনন্দই দেয় না, বরং মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে। তাই গ্রামীণ ঐতিহ্য রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার।