জার্মান ফুটবলের সোনালী অতীত এখন কেবলই ইতিহাস। একসময় বিশ্বমঞ্চে যাদের দাপট ছিল প্রশ্নাতীত, সেই জার্মানি এখন ধুঁকছে চরম ব্যর্থতায়। পশ্চিম জার্মানি হিসেবে খেলার সময়সহ চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও তিনবারের ইউরোপীয় পরাশক্তিদের বর্তমান পারফরম্যান্স ভক্তদের হতাশ করছে। বিশ্বমঞ্চে টানা ব্যর্থতার ধারাবাহিকতায় এবার যুক্ত হলো নতুন এক দুঃখজনক অধ্যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের বস্টনে অনুষ্ঠিত নকআউট (সরাসরি বিদায়) পর্বের প্রথম ম্যাচেই প্যারাগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে (পেনাল্টি শুটআউট) ৪-৩ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিয়েছে হুলিয়ান নাগেলসমানের দল। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ গোলে সমতায় থাকার পর পেনাল্টি শুটআউটে নির্ধারণ হয় ম্যাচের ভাগ্য। জার্মানির এই বিদায়কে দেশের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘বিল্ড’ তাদের প্রথম পাতায় ‘জার্মান ফুটবলের পরবর্তী দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে এ নিয়ে টানা তিনবার গ্রুপ পর্ব কিংবা নকআউটের প্রথম ধাপেই থমকে গেল জার্মানির বিশ্বজয়ের স্বপ্ন।
ম্যাচে প্রায় ৭৫ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেও প্যারাগুয়ের জমাট রক্ষণভাগ ভাঙতে পারেনি চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। উল্টো ম্যাচের শুরুতে কাউন্টার অ্যাটাকে (পাল্টা আক্রমণ) গোল করে প্যারাগুয়েকে এগিয়ে দেন ব্রাইটন ও ইপসউইচের সাবেক ফরোয়ার্ড হুলিও এনসিসো। পিছিয়ে পড়া জার্মানি অবশ্য দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ায়। আর্সেনাল তারকা কাই হাভার্টজের চমৎকার হেডে সমতায় ফেরে দল। জনাথন তাহের একটি গোল ফাউলের কারণে বাতিল হলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে এবং পরবর্তীতে টাইব্রেকার নামক ভাগ্য পরীক্ষায়।
ঐতিহাসিকভাবে পেনাল্টি শুটআউটে জার্মানির শতভাগ জয়ের যে রেকর্ড ছিল, তা ধূলিসাৎ হয়ে যায় এই ম্যাচে। হাভার্টজ এবং নিক উল্টেমাডের শট আটকে দেন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক গিল। ডিফেন্ডার জনাথন তাহ বল মারেন পোস্টের ওপর দিয়ে। শেষ পর্যন্ত হোসে কানালে ঠান্ডা মাথায় গোল করে প্যারাগুয়ের ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করেন।
ম্যাচ শেষে হতাশ জার্মান কোচ হুলিয়ান নাগেলসমান স্বীকার করেন, বিশ্বমানের দল হিসেবে জার্মানির যে পরিচয় ছিল, তা এখন প্রশ্নের মুখে। তিনি বলেন, “প্যারাগুয়ের কাছে হেরে বিদায় নেওয়া অত্যন্ত পীড়াদায়ক। টানা তিনবার বড় টুর্নামেন্টের শুরুতেই বাদ পড়ার পর আমরা আর প্রথম সারির দল হিসেবে নিজেদের দাবি করতে পারি না।” তবে পদত্যাগের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে তিনি জানান, ফুটবল ফেডারেশন (ফুটবল নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা) আস্থা রাখলে তিনি দায়িত্ব পালন করে যাবেন।
সাবেক জার্মান খেলোয়াড়দের কণ্ঠেও ছিল হতাশার সুর। সাবেক ডিফেন্ডার আর্নে ফ্রিডরিখ এই ব্যর্থতার পুরো দায় কোচের ওপর চাপিয়েছেন। অন্যদিকে, সাবেক মিডফিল্ডার থমাস হিটসলস্পারগার মনে করেন, জার্মান ফুটবলের দর্শন পরিবর্তনের সময় এসেছে। তিনি বলেন, “আমরা অতিরিক্ত পাসিং (পরস্পরের মধ্যে বল আদান-প্রদান) ও কৌশলের ওপর জোর দিয়েছি, কিন্তু ফুটবলারদের চিরচেনা লড়াইয়ের মানসিকতা হারিয়ে গেছে। এখন আর কোনো প্রতিপক্ষ জার্মানিকে ভয় পায় না।” তিনি বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার উদাহরণ দিয়ে বলেন, প্রতিভাকে ধরে রাখার পাশাপাশি জয়ী হওয়ার মানসিকতা একাডেমি (ফুটবল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র) পর্যায় থেকেই তৈরি করা প্রয়োজন।
এদিকে সমর্থকদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতোমধ্যেই নাগেলসমানের বিদায় এবং লিভারপুলের সাবেক মাস্টারমাইন্ড (সেরা পরিচালক) ইয়ুর্গেন ক্লপকে দায়িত্বে আনার দাবি জোরদার হচ্ছে। ফুটবল বোদ্ধাদের মতে, মাঠের কৌশলের পাশাপাশি দলের ভেতরে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনাই এখন জার্মান ফুটবলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।