রাজপথের লড়াকু সৈনিক থেকে শুরু করে শিক্ষক, আইনজীবী আর নামী শিল্পীরা এখন এক কাতারে। লক্ষ্য একটাই—ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের দলীয় টিকিট। রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘিরে এখন উৎসব আর উৎকণ্ঠার এক মিশেল আবহ বিরাজ করছে।
গত দুই দিন ধরে নয়াপল্টনের চিত্রটা অনেকটাই বদলে গেছে। ব্যানার, ফেস্টুন আর নেতাকর্মীদের ভিড়ে সরগরম দলীয় কার্যালয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহীদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন দায়িত্বরতরা। বিএনপির দপ্তর সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্র ও শনিবার—এই দুই দিনে মোট এক হাজার ২৫ জন নারী নেত্রী ও সমর্থক দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। আজ রোববার ফরম কেনা ও জমা দেওয়ার শেষ দিন হওয়ায় ভিড় আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় যেমন আছেন রাজপথের অভিজ্ঞ নেত্রীরা, তেমনি আছেন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ। কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন ও কনকচাঁপা থেকে শুরু করে শিক্ষক, আইনজীবী এবং সাবেক ছাত্রদল নেত্রীরাও এই দৌড়ে সামিল হয়েছেন। প্রত্যেকেই নিজ নিজ জীবনবৃত্তান্ত আর দলের জন্য বিগত দিনের ত্যাগ ও সংগ্রামের খতিয়ান তুলে ধরছেন নীতিনির্ধারকদের সামনে। কেউ কেউ সংসদ ভবন, সচিবালয় কিংবা শীর্ষ নেতাদের বাসভবনে গিয়ে তদবির করছেন নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে।
তবে এই উৎসবের আবহের মধ্যেও এক ধরনের চাপা ক্ষোভ ও অস্বস্তি কাজ করছে তৃণমূলের ত্যাগী নেত্রীদের মাঝে। তাঁদের অভিযোগ, বিগত ১৭ বছর ধরে জেল-জুলুম আর রাজপথের নির্যাতন সহ্য করে যারা দলকে টিকিয়ে রেখেছেন, এখন মূল্যায়নের সময় ‘হঠাৎ আসা’ মুখগুলো তাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে গতকাল শনিবার দলীয় কার্যালয়ে কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপাকে দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন অনেক নেত্রী। তাঁদের দাবি, যারা দুঃসময়ে দলের পাশে ছিলেন না, তাদের ‘হাইব্রিড’ (সুবিধাবাদী নবাগত) হিসেবে আখ্যা দিয়ে বর্জন করা উচিত।
তৃণমূলের এই ক্ষোভের বিষয়ে বগুড়া জেলা বিএনপির এক নেত্রী সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, যারা রাজপথের আন্দোলনে ছিল না, তারা কীভাবে মনোনয়নের দাবিদার হয়? তবে দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁদের মতে, সংসদে দলের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারেন এবং সমাজে যাদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি আছে, তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষ করে যারা বিগত জাতীয় নির্বাচনে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও সুযোগ পাননি, তাঁদের ওপর আলাদা সহানুভূতি থাকবে দলের।
মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় জোরেশোরে আলোচনায় আছেন হাসনা জসিম উদ্দীন মওদুদ, ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, ডা. খোন্দকার আকতারা খাতুন লুনা, হেলেন জেরিন খান, শিরিন সুলতানা এবং রেহেনা আকতার রানুর মতো পরিচিত মুখগুলো। সাবেক সংসদ সদস্যদের অনেকেই আবারও ফিরতে চান সংসদীয় রাজনীতিতে। তাঁরা বলছেন, দল যেন যোগ্যদের মূল্যায়ন করে এবং কোনোভাবেই সুবিধাবাদীদের প্রশ্রয় না দেয়।
বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এবং সংসদে জোরালোভাবে কথা বলার দক্ষতা—এই দুটি বিষয়কেই মানদণ্ড হিসেবে ধরা হবে। নীতিনির্ধারকরা বলছেন, দলের দুর্দিনের কাণ্ডারিদের পাশাপাশি পেশাজীবী ও জনপ্রিয় মুখগুলোর মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রেখেই চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হবে।
একটি রাজনৈতিক দলের জন্য সংরক্ষিত আসনগুলো কেবল সংখ্যা পূরণের মাধ্যম নয়, বরং তৃণমূলের নারী নেতৃত্বকে সামনে আনার বড় সুযোগ। তবে পরিচিত মুখ বনাম ত্যাগী নেত্রীদের এই লড়াই দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। শেষ পর্যন্ত দল কি কেবল জনপ্রিয়তাকে প্রাধান্য দেবে, নাকি রাজপথের ঘাম ও রক্ত ঝরানো নেত্রীদের মূল্যায়ন করবে? এই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে তৃণমূলের নারী কর্মীদের আগামী দিনের মনোবল।