বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুসংহত করতে প্রণীত দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে বাতিল করায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল মতিন। তাঁর মতে, সরকারের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের মূল সত্তা বা হৃৎপিণ্ডে আঘাত করার শামিল, যা অদূর ভবিষ্যতে দেশের জন্য বড় ধরনের সর্বনাশ বয়ে আনতে পারে।
শনিবার (১১ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বিচারপতি আবদুল মতিন এসব মন্তব্য করেন। সুপ্রিম কোর্ট আইন অধ্যাদেশ-২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্ট বিচারক আইন অধ্যাদেশ-২০২৫-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন’ ও ‘আইন ও বিচার’ পত্রিকা এই সভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান।
আলোচনায় বিচারপতি মতিন বলেন, ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার রায়ের মূল চেতনা ছিল বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করা। আলোচিত অধ্যাদেশ দুটিতে সেই রায়েরই প্রতিফলন ঘটেছিল। কিন্তু সরকার সংসদে তা বাতিল করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিচার ব্যবস্থাকে এভাবে নিয়ন্ত্রণ করার পরিণাম কখনো ভালো হয় না।
মুক্ত আলোচনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিচার বিভাগ পৃথককরণ মামলার মূল বাদী এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মাসদার হোসেন। তিনি বলেন, “সংসদীয় ক্ষমতার দাপটে আপনারা আজ মালিক হয়ে বসেছেন। কিন্তু মনে রাখবেন, সংসদ সার্বভৌম নয়; জনকল্যাণ নিশ্চিত করাই এর মূল কাজ।” তিনি অভিযোগ করেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করার মাধ্যমে সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ৪৭ লাখ মামলার জটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচার বিভাগ এখন বিচারপ্রার্থীদের আশ্রয়ের বদলে নির্যাতনের জায়গায় পরিণত হয়েছে।
সাবেক এই বিচারক আরও বলেন, ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে এক কলমের খোঁচায় জনগুরুত্বপূর্ণ আইন বাতিল করা ‘মগের মুল্লুক’ বা স্বেচ্ছাচারিতার নামান্তর। তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মত প্রকাশের দায়ে ২৮ জন বিচারককে শোকজ (কারণ দর্শানোর নোটিশ) করার কোনো আইনি কর্তৃত্ব আইন মন্ত্রণালয়ের নেই। বিচারকদের যেকোনো প্রশাসনিক প্রয়োজনে কেবল সুপ্রিম কোর্টের কাছে দায়বদ্ধ থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি এই হস্তক্ষেপকে বিচার বিভাগের অবমাননা হিসেবে অভিহিত করেন।
অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনের নেতা আরিফ সোহেলসহ অন্যান্য বক্তারাও বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেন। তাঁরা বলেন, যারা গুম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই করে আজ ক্ষমতায় এসেছেন, তাঁদের উচিত হবে না জুলাই বিপ্লবের শহীদানদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করা। বক্তারা মনে করেন, বর্তমানে সাধারণ মানুষের মধ্যে জরিপ করলে ৯৯ শতাংশ লোকই বিচার বিভাগকে পদদলিত করার এই সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মত দেবেন।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। মাসদার হোসেন মামলার আড়াই দশক পেরিয়ে গেলেও বিচার বিভাগ পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা পায়নি, বরং বারবার তা নির্বাহী বিভাগের অধীনে রাখার চেষ্টা চলেছে। সরকারের সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপ বিচারকদের মনে ভীতি সঞ্চার করতে পারে এবং বিচারপ্রার্থীদের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে বিচার বিভাগকে তার স্বকীয়তা ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া সময়ের দাবি। অন্যথায়, আইনি ব্যবস্থার এই ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে।