উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে (রাউন্ড অব ১৬) যখন পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ও ইউরোপের উদীয়মান শক্তি নরওয়ে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, তখন বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের চোখ কেবল দল দুটির ওপরই নয়, বরং দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী তারকার মাঠের ভেতরের লড়াইয়ের ওপরও নিবদ্ধ থাকবে। তাঁরা হলেন ব্রাজিলের রক্ষণভাগের নির্ভরযোগ্য প্রহরী গাব্রিয়েল মাগালহায়েস এবং নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হলান্ড। ক্লাব ফুটবলের আঙিনা থেকে শুরু হওয়া এই দুই তারকার ব্যক্তিগত ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াই এবার অনূদিত হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের রাজকীয় মঞ্চে।
বাংলাদেশ সময় রোববার রাত ২টায় নিউইয়র্কের বিখ্যাত স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার-ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে নামবে এই দুই দল। ২০০২ সালের পর থেকে দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ট্রফির হাহাকার চলছে সেলেসাওদের (ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দল) তাঁবুতে। অন্যদিকে, নরওয়ে তাদের ফুটবল ইতিহাসে কখনই শেষ ষোলোর বৈতরণী পার হতে পারেনি। এবার প্রথমবারের মতো শেষ আটে জায়গা করে নিতে নরওয়েবাসী তাকিয়ে থাকবে তাদের প্রধান ভরসা হলান্ডের দিকে। বিপরীতে, ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তির প্রধান ছকই হবে হলান্ডকে বোতলবন্দি করা, আর সেই গুরুদায়িত্ব থাকবে ডিফেন্ডার গাব্রিয়েলের কাঁধে।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে হলান্ড এবং আর্সেনালের জার্সিতে গাব্রিয়েল বহুবার মুখোমুখি হয়েছেন। মাঠের খেলায় তাঁদের ব্যক্তিগত টানাপোড়েন এবং একে অপরকে খোঁচা দেওয়ার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ইংল্যান্ডের সাবেক কিংবদন্তি অধিনায়ক অ্যালান শিয়েরারও এই দুই তারকার মাঠের লড়াই বেশ উপভোগ করেন। এই ম্যাচ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "এটি একটি দারুণ লড়াই হবে কারণ তাদের মধ্যে মাঠের ভেতরে ও বাইরে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা রয়েছে। তারা একে অপরকে পছন্দ করে না, যা খুবই স্বাভাবিক। মাঠের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে পছন্দ করার কোনো প্রয়োজনও নেই।"
হলান্ড ও গাব্রিয়েলের এই বৈরিতার সূচনা হয়েছিল ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। প্রিমিয়ার লিগের এক ম্যাচে ম্যানচেস্টার সিটির জন স্টোনস একেবারে শেষ মুহূর্তে (৯৮তম মিনিটে) গোল করে খেলা ড্র করার পর, হতাশায় জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে রাখা গাব্রিয়েলের মাথায় পেছন থেকে বল ছুঁড়ে মারেন হলান্ড। ম্যাচ শেষে আর্সেনাল কোচ মিকেল আর্তেতাকে উদ্দেশ্য করে হলান্ড টিপ্পনি কেটে বলেছিলেন, "বিনয়ী হতে শিখুন।"
গাব্রিয়েলও এই অপমানের বদলা নিতে দেরি করেননি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ম্যানচেস্টার সিটিকে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত করার ম্যাচে গোল করে হলান্ডের মুখের সামনে গিয়ে বুনো উল্লাস প্রকাশ করেন গাব্রিয়েল। এরপর এপ্রিল মাসে সিটি ২-১ ব্যবধানে জিতলে হলান্ড আবার ক্যামেরা লক্ষ্য করে বিখ্যাত মার্কিন গায়ক ফ্লো রিডার ‘গুড ফিলিং’ (ভালো অনুভূতি) গানের লাইন গেয়ে গাব্রিয়েলকে উপহাস করেন। তবে শেষ হাসি হাসেন গাব্রিয়েলই। মে মাসে দীর্ঘ ২৪ বছর পর আর্সেনাল যখন প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জয় করে, তখন গাব্রিয়েল ট্রফি হাতে নিজের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন, যার আবহসংগীত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল হলান্ডের সেই গাওয়া গানের সুরটি।
ক্লাব ফুটবলের সেই অমীমাংসিত লড়াই এবার বিশ্বকাপ মঞ্চে রূপ নিতে যাচ্ছে। নিউইয়র্কের সবুজ গালিচায় কে হাসবেন শেষ হাসি—ডিফেন্ডার গাব্রিয়েল নাকি স্ট্রাইকার হলান্ড, তা দেখার অপেক্ষায় পুরো ফুটবল বিশ্ব।