ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই বাংলাদেশে এক অন্যরকম উন্মাদনা; শহর থেকে গ্রাম, চায়ের দোকান থেকে বসার ঘর—সব জায়গায় কেবলই ফুটবলের রাজত্ব। কিন্তু ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ টেলিভিশনের পর্দায় দেখা নিয়ে দেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মনে যে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, অবশেষে আসর শুরুর ঠিক এক সপ্তাহ আগে সেই কালো মেঘ কেটে গেছে। আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থার (ফিফা) কাছ থেকে সরাসরি সম্প্রচার স্বত্ব কিনে নিয়েছে বাংলাদেশের তিনটি টেলিভিশন মাধ্যমের একটি সম্মিলিত জোট, যার ফলে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ পাচ্ছেন দেশের দর্শকরা।
চার বছর পরপর আসা ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে বাঙালি দর্শকদের আবেগ ও উন্মাদনা বিশ্বজুড়েই একটি পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু ২০২৬ সালের এই বৈশ্বিক আসর মাঠে গড়ানোর আগে বাংলাদেশের দর্শকদের মনে এক অজানা ভয় কাজ করছিল। দেশের কোনো সম্প্রচার মাধ্যম খেলা দেখাবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছিল চরম অনিশ্চয়তা। তবে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দেশের ফুটবল ভক্তদের জন্য স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে তিনটি দেশীয় টেলিভিশন মাধ্যম।
জানা গেছে, এবারের বিশ্বকাপের প্রতিটি খেলা সরাসরি সম্প্রচার করবে দেশের বেসরকারি সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন মাধ্যম ‘সময় টেলিভিশন’। একই সঙ্গে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন’ (বিটিভি) এবং খেলাধুলা বিষয়ক একমাত্র দেশীয় মাধ্যম ‘টি-স্পোর্টস’-এর পর্দায়ও বিশ্বকাপের লড়াই উপভোগ করা যাবে। এই তিনটি টেলিভিশন মাধ্যম একত্রে একটি ব্যবসায়িক জোট (কনসোর্টিয়াম) গঠন করে আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে এই সম্প্রচার স্বত্ব কিনে নিয়েছে।
তবে এই স্বত্ব পাওয়ার পেছনের গল্পটা মোটেও সহজ ছিল না। শুরুতে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ‘স্প্রিংবক প্রাইভেট লিমিটেড’ নামের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থার কাছ থেকে বাংলাদেশের জন্য সম্প্রচার স্বত্ব কিনে নিয়েছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল স্থানীয় টেলিভিশন মাধ্যমগুলোর কাছে চড়া দামে এই স্বত্ব বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করা। কিন্তু স্থানীয় বাজারের সীমাবদ্ধতা এবং উচ্চমূল্যের কারণে তারা এই স্বত্ব বিক্রি করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না পেয়ে টুর্নামেন্ট শুরুর দুই সপ্তাহেরও কম সময় আগে প্রতিষ্ঠানটি এই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায়।
বিদেশি ওই প্রতিষ্ঠানের এমন আকস্মিক সিদ্ধান্তে দেশে কার্যত এমন কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না, যারা এত অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে বিশ্বকাপের খেলা সম্প্রচারের দায়িত্ব নিতে পারে। সারা দেশের ফুটবল পাগল মানুষ যখন টিভিতে খেলা দেখা থেকে বঞ্চিত হওয়ার প্রহর গুনছিল, ঠিক সেই চরম সংকটময় মুহূর্তে ত্রাণকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসেন সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল।
এই জটিলতা নিরসনে তারা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। দেশের কোটি মানুষের আবেগের কথা মাথায় রেখে তারা বিভিন্ন খেলাধুলা বিষয়ক চ্যানেল, জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যম, মুঠোফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন ভিডিও সম্প্রচার মাধ্যমের (ওটিটি প্ল্যাটফর্ম) শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন। অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে তারা তথ্যপ্রযুক্তি ও মুঠোফোন খাত থেকে আয়ের এমন কিছু নতুন উৎস খুঁজে বের করেন, যা বাংলাদেশের ক্রীড়া সম্প্রচারের ইতিহাসে অতীতের কোনো বিশ্বকাপে ব্যবহার করা হয়নি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ও আনন্দের বিষয় হলো, এবারের বিশ্বকাপ সম্প্রচারের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম বিটিভির নিজস্ব তহবিল থেকে এক কানাকড়িও খরচ করতে হচ্ছে না। নতুন এই আর্থিক কাঠামো অনুযায়ী, খেলা সম্প্রচারের সম্পূর্ণ বিশাল ব্যয়ভার যৌথভাবে বহন করবে দেশের বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন মাধ্যমগুলো এবং মুঠোফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। এর ফলে সরকারি কোষাগারের অর্থের কোনো অপচয় যেমন হলো না, তেমনি প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষও বিটিভির মাধ্যমে একেবারে বিনা খরচে তাদের প্রিয় দলের খেলা উপভোগ করার সুযোগ পেলেন।
ফুটবল বিশ্বকাপের মতো একটি বৈশ্বিক আসরের সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা আমাদের দেশের ক্রীড়া সম্প্রচার খাতের একটি বড় দুর্বলতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। বিদেশি মধ্যস্বত্বভোগী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা যে কত বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে, সিঙ্গাপুরের ওই প্রতিষ্ঠানের চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তবে এই চরম সংকটের মুহূর্তে সরকারি ও বেসরকারি খাতের যে সম্মিলিত প্রচেষ্টা আমরা দেখলাম, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাত ও মুঠোফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করে আয়ের নতুন উৎস তৈরি করার এই অভিনব মডেলটি ভবিষ্যতে যেকোনো বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর সম্প্রচারের ক্ষেত্রে একটি চমৎকার উদাহরণ হয়ে থাকবে। ক্রীড়া বিনোদন যেন কেবল ব্যবসায়িক গ্যাঁড়াকলে আটকে না থাকে এবং দেশের প্রান্তিক মানুষের বিনোদনের অধিকার যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভবিষ্যতে আরও আগে থেকেই এমন সুদূরপ্রসারী ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।