শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই সবুজ গালিচায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন ইলয় রুম। দীর্ঘক্ষণ মাথা নুইয়ে যেন পরম তৃপ্তির স্বাদ নিচ্ছিলেন এই অদম্য গোলরক্ষক। সতীর্থরা ততক্ষণে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠেছেন। মুহূর্তের ঘোরে হঠাৎ তাদের মনে পড়ল আসল নায়কের কথা। সবাই ছুটে গেলেন রুমের কাছে, আর তাকে ঘিরেই শুরু হলো উৎসবের আসল প্রহর। ধারাভাষ্যকক্ষ থেকে তখন ভেসে আসছে রোমাঞ্চিত এক কণ্ঠ, ‘গোটা বিশ্বকে চমকে দিল কুরাসাও!’
ম্যাচের ফল গোলশূন্য ড্র, কিন্তু মাত্র দেড় লাখ মানুষের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাওয়ের জন্য এটি ছিল বিশ্বকাপ জয়ের চেয়েও বড় কিছু। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে তারা শুধু প্রথম পয়েন্টই পায়নি, বরং লাতিন আমেরিকার অন্যতম পরাশক্তি একুয়েডরকে রুখে দিয়ে অনন্য এক ইতিহাস রচনা করেছে।
লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে শক্তিশালী আর্জেন্টিনার ঠিক পেছনেই দ্বিতীয় স্থানে থেকে মূল পর্বে এসেছিল একুয়েডর। ফুটবল বোদ্ধারা তাদের এবারের আসরের অপ্রত্যাশিত চমক (ডার্ক হর্স) হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই শক্তিশালী দলটিকেই চরম হতাশায় ডুবিয়েছে ক্যারিবিয়ান সাগরের তীরের ছোট্ট এই দেশটি। আগের ম্যাচেই শক্তিশালী জার্মানির কাছে ৭ গোল হজম করে বিশ্বকাপ শুরু করেছিল কুরাসাও। সেই দুঃস্বপ্ন থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে এমন বীরত্বপূর্ণ পারফরম্যান্স ফুটবল বিশ্বকে রীতিমতো স্তব্ধ করে দিয়েছে।
এই অকল্পনীয় রূপকথার মহানায়ক কুরাসাওয়ের ৩৭ বছর বয়সী গোলরক্ষক ইলয় রুম। যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব মায়ামি এফসিতে খেলা এই অভিজ্ঞ খেলোয়াড় একুয়েডরের আক্রমণভাগের সামনে যেন দুর্ভেদ্য চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। পুরো ম্যাচে তিনি প্রতিপক্ষের নিশ্চিত ১৫টি গোল প্রচেষ্টা প্রতিহত (সেভ) করেছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি শট ঠেকানোর রেকর্ডটি যুক্তরাষ্ট্রের টিম হাওয়ার্ডের। ২০১৪ সালের আসরে বেলজিয়ামের বিপক্ষে তিনি ১৬টি শট আটকেছিলেন, তবে সেটি ছিল অতিরিক্ত সময়সহ। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলায় রুমের এই ১৫টি শট প্রতিহত করার কীর্তি এখন বিশ্বকাপের নতুন রেকর্ড।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাস সিটিতে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচের শুরু থেকেই চলে একুয়েডরের আক্রমণ আর কুরাসাওয়ের প্রতিরোধের লড়াই। ম্যাচের তৃতীয় মিনিটেই গোলের সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল একুয়েডর। কিন্তু এনার ভ্যালেন্সিয়ার দুর্দান্ত শটটি বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে রুখে দেন রুম। এরপর পুরো ম্যাচজুড়েই চলে তার অতিমানবীয় নৈপুণ্য। খুব কাছ থেকে নেওয়া প্রতিপক্ষের অন্তত পাঁচটি হেড অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি।
পরিসংখ্যান বলছে, পুরো ম্যাচে বলের নিয়ন্ত্রণ একচেটিয়াভাবে একুয়েডরের পায়েই ছিল। তারা গোলমুখে মোট ২৬টি শট নেয়, যার মধ্যে ১৫টি ছিল সরাসরি লক্ষ্যে (অন টার্গেট)। কিন্তু এই সংখ্যাগুলো কেবল একুয়েডরের আধিপত্যের প্রমাণ নয়, বরং ইলয় রুম আর কুরাসাওয়ের রক্ষণের অদম্য লড়াইয়ের এক জীবন্ত দলিল।
নেদারল্যান্ডস রাজ্যের অধীনস্থ সাংবিধানিক দেশ কুরাসাও মূলত মূল দ্বীপ এবং জনবসতিহীন ‘লিটল কুরাসাও’ নিয়ে গঠিত। ভেনেজুয়েলার উত্তরে অবস্থিত এই দেশ ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ আমেরিকার পাশে হলেও কনক্যাকাফ অঞ্চলে খেলে থাকে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৮১ নম্বরে থাকা এই দলটিই এখন বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিস্ময়।
অন্যদিকে, অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপে আসা একুয়েডর দুই ম্যাচ খেলেও কোনো গোলের দেখা পেল না। নিজেদের প্রথম ম্যাচে তারা আইভরি কোস্টের কাছে ১-০ ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিল। ‘ই’ গ্রুপ থেকে এরই মধ্যে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করেছে শক্তিশালী জার্মানি। আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোনো দল পরবর্তী পর্ব (নকআউট) থেকে ছিটকে যায়নি। তবে আশা বাঁচিয়ে রাখতে হলে শেষ ম্যাচে জয় ছাড়া কোনো বিকল্প নেই একুয়েডর ও কুরাসাওয়ের। শেষ ম্যাচে একুয়েডরের প্রতিপক্ষ গ্রুপের শীর্ষে থাকা জার্মানি, আর নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্নে বিভোর কুরাসাও লড়বে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে।