পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের হেক্সা (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ট্রফি) জয়ের স্বপ্ন আরও একবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ২০২৬ ফিফা (আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন) বিশ্বকাপের রাউন্ড অব সিক্সটিনের (১৬ দলের পর্ব) ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে সেলেসাওরা (ব্রাজিল দলের ডাকনাম)। এই হারের মধ্য দিয়ে টানা ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ইউরোপের কোনো দলের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার চরম লজ্জাজনক রেকর্ড গড়ল লাতিন আমেরিকার পরাশক্তিরা। আক্রমণভাগে তারকা ফুটবলারদের ছড়াছড়ি থাকলেও মাঠের ভুল পরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতায় ডুবতে হয়েছে কোচ কার্লো আনচেলত্তির দলকে। ম্যাচ বিশ্লেষণে ব্রাজিলের এই অপ্রত্যাশিত বিদায়ের পেছনে মূলত ছয়টি বড় কারণ উঠে এসেছে।
১. শুরুর একাদশ নির্বাচনে ভুল: ইনজুরির (আঘাত) কারণে নিয়মিত মিডফিল্ডার (মধ্যমাঠের খেলোয়াড়) লুকাস পাকুয়েতা খেলতে না পারায় তাঁর বিকল্প নির্বাচন করা ছিল কোচের অন্যতম বড় পরীক্ষা। তবে সৃজনশীল মিডফিল্ডার হিসেবে দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ তারকা নেইমারকে ব্যবহার না করে শুরুর একাদশে সুযোগ দেওয়া হয় গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লিকে। আর্সেনালের এই ফরোয়ার্ড (আক্রমণভাগের খেলোয়াড়) ম্যাচে কোচের আস্থার প্রতিদান দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। ৬৭ মিনিট মাঠে থেকে তিনি মাত্র ২০টি সফল পাস দেন এবং একটি সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করেন, যা দলের আক্রমণভাগের ছন্দ নষ্ট করে।
২. পেনাল্টি থেকে সুবিধা নিতে ব্যর্থতা: ম্যাচের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। অথচ ভিনিসিয়াস জুনিয়র বা ম্যাথিয়াস কুনাদের মতো অভিজ্ঞ ফুটবলাররা মাঠে থাকা সত্ত্বেও পেনাল্টি শট নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্রুনো গুইমারেসকে। গুইমারেসের দুর্বল শটটি সহজেই প্রতিহত করেন নরওয়ের গোলরক্ষক। এই সুবর্ণ সুযোগটি কাজে লাগাতে পারলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ব্রাজিলের হাতে চলে আসতে পারত।
৩. মিডফিল্ডে নরওয়ের আধিপত্য: পাকুয়েতার অনুপস্থিতিতে ব্রাজিলের মাঝমাঠের দুর্বলতা পুরোপুরি উন্মোচিত হয়েছে। নরওয়ের মাঝমাঠের তিন খেলোয়াড় স্যান্ডার বার্গ, প্যাট্রিক বার্গ ও মার্টিন ওডেগার্ড পুরো ম্যাচে ব্রাজিলের ওপর ছড়ি ঘুরিয়েছেন। এই ত্রয়ী মিলে ম্যাচে প্রায় ২৫০টি সফল পাস আদান-প্রদান করেন, যেখানে ব্রাজিলের মিডফিল্ডাররা ৮০টি সফল পাসও পূর্ণ করতে পারেননি।
৪. একের পর এক সুযোগ হাতছাড়া: ম্যাচে অন্তত পাঁচটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ তৈরি করলেও ফিনিশিংয়ের (গোল করার চূড়ান্ত মুহূর্ত) অভাবে তা কাজে লাগাতে পারেনি সেলেসাওরা। বদলি খেলোয়াড় এন্ড্রিকসহ ভিনিসিয়াস ও মার্টিনেল্লি সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেন। পাশাপাশি নরওয়ের গোলরক্ষক অরইয়ান নাইলান্ড কয়েকটি চোখধাঁধানো সেভ (রক্ষা) করে ব্রাজিলের পথ আগলে দাঁড়ান।
৫. বিতর্কিত বদলি সিদ্ধান্ত: মাঝমাঠে দারুণ খেলতে থাকা ব্রুনো গুইমারেসকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার পর ব্রাজিল পুরোপুরি খেলার নিয়ন্ত্রণ হারায়। ৩৪ বছর বয়সী ক্যাসেমিরো অফ-ফর্মে থাকা সত্ত্বেও তাঁকে পুরো ম্যাচ খেলানো এবং ইনফর্ম (ফর্মে থাকা) গুইমারেসকে তুলে নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে কুনার বদলে এন্ড্রিককে নামানোর সিদ্ধান্তও দলে ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।
৬. দুর্বল রণকৌশল: সাধারণত বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে খেলতে অভ্যস্ত ব্রাজিল এই ম্যাচে রক্ষণাত্মক কৌশল বেছে নেয়। নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলের বলের দখল ছিল মাত্র ৩৪ শতাংশ, যেখানে আগের ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে ছিল ৬৮ শতাংশ। বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার এই ভুল আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নরওয়েকে নিজেদের ছন্দে খেলতে সাহায্য করে এবং তারা ম্যাচটি জিতে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে।
বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার হিসেবে এসে এভাবে বিদায় নেওয়া ব্রাজিলের টিম ম্যানেজমেন্ট (দলীয় ব্যবস্থাপনা) এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।