বিশ্বকাপ ফুটবলের রোমাঞ্চকর ইতিহাস কেবল নান্দনিক গোল, অসাধারণ ড্রিবলিং (বল নিয়ে কারিকুরি) কিংবা ট্রফি জয়ের উল্লাসেই সীমাবদ্ধ নয়। মাঠের চরম উত্তেজনা, অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাত ও লাল কার্ড দেখার ঘটনাও এই বিশ্বমঞ্চের ইতিহাসের এক বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। কখনো কখনো মাঠের শৃঙ্খলাভঙ্গ ও লাল কার্ড দেখে কোনো গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের বিদায় পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ২২টি ফুটবল বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে ১৭৭ বার লাল কার্ড ব্যবহার করেছেন ম্যাচ পরিচালকেরা (রেফারি)।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি লাল কার্ড দেখার অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডটি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের। মাঠের নান্দনিক ফুটবলের জন্য পরিচিত সেলেসাওদের (ব্রাজিল দল) ফুটবলাররা এখন পর্যন্ত মোট ১১ বার লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়েছেন। এই তালিকায় ঠিক পরেই রয়েছে তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা। আলবিসেলেস্তেদের (আর্জেন্টিনা দল) খেলোয়াড়রা বিশ্বমঞ্চে এ পর্যন্ত ১০ বার লাল কার্ড পেয়েছেন। উরুগুয়ে ও ক্যামেরুন যৌথভাবে রয়েছে তৃতীয় স্থানে; দুই দলের ফুটবলাররাই ৯টি করে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এছাড়া ইউরোপের তিন ফুটবল পরাশক্তি জার্মানি, ইতালি ও নেদারল্যান্ডসের খেলোয়াড়রা ৮ বার করে মাঠ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন।
বিশ্বকাপে কার্ড প্রথার প্রবর্তন কিন্তু খুব বেশি পুরনো নয়। ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথম হলুদ ও লাল কার্ডের নিয়ম চালু করা হয়। তবে বাস্তব বিষয় হলো, নিয়ম চালুর সেই আসরে কোনো খেলোয়াড়কেই লাল কার্ড দেখতে হয়নি। এর আগে ১৯৫০ সালের আসরটিও শেষ হয়েছিল কোনো লাল কার্ড ছাড়াই। বিশ্বকাপে ইতিহাসের প্রথম লাল কার্ডটি দেখা যায় ১৯৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপে। চিলির আক্রমণভাগের খেলোয়াড় (ফরোয়ার্ড) কার্লোস কাসেলিকে প্রথম লাল কার্ড দেখিয়ে ইতিহাসের অংশ হন তুরস্কের ম্যাচ পরিচালক দোয়ান বাবাজান।
একটি টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি লাল কার্ড দেখার রেকর্ডটি হয়েছিল ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে। সেই আসরে রেকর্ড ২৮ বার লাল কার্ড ব্যবহার করতে হয়েছিল ম্যাচ পরিচালকদের। ওই বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যকার ম্যাচটি ইতিহাসে সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ হিসেবে পরিচিত। রুশ রেফারি ভ্যালেন্তিন ইভানভ সেই ম্যাচে রেকর্ড ৪টি লাল কার্ড ও ১৬টি হলুদ কার্ড দেখিয়েছিলেন। পর্তুগালের ডেকো ও কস্তিনিয়া এবং নেদারল্যান্ডসের খালিদ বুলাহরুজ ও জিওভান্নি ফন ব্রঙ্কহর্স্ট সেদিন মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন।
বিশ্বকাপের ফাইনাল বা চূড়ান্ত পর্বেও লাল কার্ডের নাটকীয়তা দেখা গেছে। ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপের ফাইনালে প্রথমবার কোনো খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখেন। পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের খেলোয়াড় (ডিফেন্ডার) পেদ্রো মনসন এবং পরবর্তীতে গুস্তাভো দেজোত্তি লাল কার্ড পান। নয়জনের দলে পরিণত হওয়া আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি (শাস্তিমূলক স্পট কিক) থেকে গোল খেয়ে শিরোপা হারায়। এছাড়া ২০০২ বিশ্বকাপে তুরস্কের দুটি লাল কার্ডই এসেছিল ব্রাজিলের বিপক্ষের একটি নাটকীয় ম্যাচে, যা দলটির ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।