আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার করল স্পেন। ফাইনালে লাতিন আমেরিকার পরাশক্তিদের ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা নিজেদের করে নিয়েছে স্প্যানিশরা। ম্যাচের ১০৬ মিনিটে স্পেনের ফরোয়ার্ড ফেরান তোরেসের করা একমাত্র গোলটি দীর্ঘ ১৬ বছর পর ইউরোপের এই দলটিকে বিশ্বজয়ের আনন্দে ভাসিয়েছে। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের মধ্য দিয়ে যেমন বিশ্বমঞ্চে স্পেনের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তেমনি টুর্নামেন্টের ব্যক্তিগত পুরস্কারের তালিকাতেও আধিপত্য দেখিয়েছে স্প্যানিশ ফুটবলাররা।
পুরো আসর জুড়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করেও শেষ পর্যন্ত ট্রফিহীন ও খালি হাতে বিদায় নিতে হয়েছে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে। ফুটবলপ্রেমীদের ধারণা ছিল, আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ (সোনার বল) মেসির হাতেই উঠবে। তবে ফাইনালে দল হেরে যাওয়ায় সেই সমীকরণ বদলে গেছে। আসরের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জয় করেছেন স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি। মাঝমাঠের এই সেনাপতি পুরো টুর্নামেন্টে ৮টি ম্যাচে মোট ৭২৬ মিনিট মাঠে ছিলেন। এই সময়ে তিনি ৬৯২টি নিখুঁত পাস দিয়েছেন, যা যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি। তার পাসের সাফল্যের হার ছিল অবিশ্বাস্য ৯৪ শতাংশ। এ ছাড়া রক্ষণে সহযোগিতা করতে গিয়ে ১৩ বার সফলভাবে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়েছেন তিনি।
ফাইনাল ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণী গোলটি করে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে নিয়েছেন স্পেনের ফেরান তোরেস। অতিরিক্ত সময়ে তার করা সেই দর্শনীয় গোলটিই স্পেনকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মুকুট এনে দেয়।
বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ‘গোল্ডেন বুট’ (সোনার বুট) জিতে নিয়েছেন ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে। টুর্নামেন্ট জুড়ে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে তিনি মোট ১০টি গোল করেছেন। যদিও তার দল ফাইনালের আগেই বিদায় নিয়েছিল, তবুও গোল করার দক্ষতায় এমবাপেকে কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারেনি।
স্পেনের এই বিশ্বজয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল তাদের রক্ষণভাগের। পুরো আসরে মাত্র একটি গোল হজম করা স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমন জিতে নিয়েছেন সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ (সোনার গ্লাভস)। পুরো টুর্নামেন্টে ৭টি ম্যাচে কোনো গোল না খেয়ে মাঠ ছাড়ার অনন্য কীর্তি (ক্লিনশিট) গড়েন তিনি। আসরে টানা ৬৪৯ মিনিট গোল না খাওয়ার অবিস্মরণীয় রেকর্ড গড়েছেন গোল্ডেন গ্লাভস জয়ী এই গোলরক্ষক।
একই সঙ্গে স্পেনের রক্ষণভাগের তরুণ তারকা পাউ কুবারসি জিতে নিয়েছেন আসরের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার। ১৯ বছর বয়সী এই তরুণ ডিফেন্ডারের রক্ষণভাগ ভেদ করে প্রতিপক্ষ দল পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল করতে সক্ষম হয়েছিল। আসর জুড়ে অসাধারণ দক্ষতায় ৩৩ বার বল বিপদমুক্ত করে দলের রক্ষণভাগকে সুরক্ষিত রেখেছিলেন তিনি।
ব্যক্তিগত অর্জনে স্প্যানিশদের এমন জয়জয়কারের মাঝেও সবচেয়ে সুশৃঙ্খল ফুটবল উপহার দিয়ে ‘ফেয়ার প্লে’ (সুশৃঙ্খল খেলার পুরস্কার) অ্যাওয়ার্ড জিতে নিয়েছে নেদারল্যান্ডস। ডাচ দলটি বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের রাউন্ড থেকেই বিদায় নিলেও মাঠের ভেতর তাদের চমৎকার আচরণ ও নিয়ম মেনে খেলার মানসিকতা ফুটবল বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছে। সব মিলিয়ে এই ফুটবল বিশ্বকাপটি স্পেনের ঐতিহাসিক ট্রফি জয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের এক অনন্য প্রদর্শনী হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।