বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় এবার এক ঐতিহাসিক লড়াইয়ের সাক্ষী হতে যাচ্ছে ক্রীড়াবিশ্ব। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে আবারও মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দুই শক্তিশালী দল নেদারল্যান্ডস ও সুইডেন। বাংলাদেশ সময় শনিবার রাত ১১টায় যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টন স্টেডিয়ামে ‘এফ’ (F) গ্রুপের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে। পরিসংখ্যান, অতীত ইতিহাস আর শক্তির বিচারে এই ম্যাচটি ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ এখন তুঙ্গে।
এবারের আসরে দুই দলের শুরুটা হয়েছে সম্পূর্ণ দুই রকমভাবে। নিজেদের প্রথম ম্যাচে এশিয়ার পরাশক্তি জাপানের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করে পয়েন্ট ভাগাভাগি করতে বাধ্য হয়েছে নেদারল্যান্ডস। অন্যদিকে, আফ্রিকান দল তিউনিসিয়াকে ৫-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে দারুণ আত্মবিশ্বাসী অবস্থায় রয়েছে সুইডেন। ফলে আজ ডাচদের (নেদারল্যান্ডস) সামনে প্রথম জয়ের কঠিন চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে সুইডিশদের লক্ষ্য নিজেদের উড়ন্ত ফর্ম অব্যাহত রাখা।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দুই দলের লড়াইয়ের ইতিহাস বেশ পুরনো হলেও, তা খুবই সংক্ষিপ্ত। এর আগে মাত্র একবারই বিশ্বমঞ্চে দেখা হয়েছিল তাদের। ১৯৭৪ সালের ওই বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের সেই লড়াইটি গোলশূন্য ড্রয়ে শেষ হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের আঙিনায় দল দুটি সব মিলিয়ে মোট ২০ বার মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ডাচদের আধিপত্যই তুলনামূলক বেশি। তাদের ৯টি জয়ের বিপরীতে সুইডেন জিতেছে ৭টি ম্যাচে। সবশেষ ২০১৭ সালের অক্টোবরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে আরিয়েন রবেনের জোড়া গোলে ২-০ ব্যবধানে জিতেছিল নেদারল্যান্ডস। সুইডেন সবশেষ ডাচদের হারিয়েছিল ২০১১ সালের অক্টোবরে, যেখানে ৩-২ গোলের রোমাঞ্চকর জয় নিয়ে তারা ২০১২ সালের ইউরো (ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ) নিশ্চিত করেছিল।
আজকের এই ম্যাচটি ঘিরে বেশ কিছু চমকপ্রদ পরিসংখ্যান সামনে এসেছে। ২০১০ সালের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পর বিশ্বকাপে নিজেদের শেষ ১৩টি ম্যাচে (নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে) কোনো হারের মুখ দেখেনি নেদারল্যান্ডস। এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো দলের যৌথভাবে সবচেয়ে দীর্ঘ অপরাজিত থাকার বিশ্বরেকর্ড। এর আগে ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত টানা ১৩ ম্যাচে অপরাজিত থেকে এই অনন্য রেকর্ড গড়েছিল ব্রাজিল। তবে নিজেদের সবশেষ দুটি ম্যাচেই ২-২ গোলে ড্র করেছে ডাচরা। আজ জয় না পেলে ১৯৭৮ থেকে ১৯৯০ সালের পর প্রথমবারের মতো টানা তিনটি ম্যাচে জয়হীন থাকার অস্বস্তিতে পড়বে তারা।
অন্যদিকে, প্রথম ম্যাচেই ৫ গোল করে রীতিমতো উড়ছে সুইডেন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ বিশ্বকাপের পুরো গ্রুপ পর্বে তারা যতগুলো গোল করেছিল, এবারের আসরে এক ম্যাচেই তা করে ফেলেছে। এর আগে কেবল ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে তারা গ্রুপ পর্বে এর চেয়ে বেশি (৬টি) গোল করেছিল। আজ জিতলে ১৯৫৮ সালের পর প্রথমবারের মতো গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচে জয়ের স্বাদ পাবে সুইডিশরা। মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বকাপে ইউরোপিয়ান দলগুলোর বিপক্ষে সুইডেনের অতীত রেকর্ড খুব একটা সুবিধার নয়। আগের সাতটি ম্যাচের মাত্র একটিতে জিতেছিল তারা, আর সেই কাঙ্ক্ষিত জয়টি এসেছিল এই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই (১৯৯৪ সালে রাশিয়ার বিপক্ষে ৩-১ গোলে)।
নেদারল্যান্ডস এবং সুইডেন—উভয় দলেরই বিশ্বকাপের ইতিহাসে একটি বড় আক্ষেপ রয়েছে। হাঙ্গেরি, চেকোস্লোভাকিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার মতো এই দুই দলও বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেও কখনো পরম আরাধ্য ট্রফিটি ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেনি। নেদারল্যান্ডস ১৯৭৪, ১৯৭৮ ও ২০১০ সালে এবং সুইডেন ১৯৫৮ সালে ফাইনালে উঠেও রানার্সআপ হয়েই সন্তুষ্ট থেকেছে। বিশ্ব ফুটবলের সেই আক্ষেপ ঘোচানোর মিশনে এবং আসরের পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার পথ সুগম করতে আজকের লড়াইয়ে কে হাসবে শেষ হাসি, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।