বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণে পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন আজ শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে দেশের ক্রিকেটের শীর্ষ সংস্থায় নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার পর, অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ কমিটির অধীনে এই প্রথম কোনো গণতান্ত্রিক ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হতে যাচ্ছে।
রোববার সকাল ১০টা থেকে মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অবস্থিত ক্রিকেট বোর্ডের কার্যালয়ে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। সকাল থেকেই স্টেডিয়াম চত্বর ও এর আশেপাশে ভোটারদের সক্রিয় উপস্থিতি ও আনন্দমুখর পরিবেশ দেখা গেছে। বিসিবি কার্যালয়ের নির্দিষ্ট বোর্ড কক্ষে ক্রিকেটার ও ক্রীড়া সংগঠকদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে দেখা যায়। এই নির্বাচনে অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয় ছিল অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ কমিটির (অ্যাড-হক কমিটি) সভাপতি ও জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক সফল অধিনায়ক তামিম ইকবালের ভোট প্রদান।
তামিম ইকবাল দ্বিতীয় বিভাগ (ক্যাটাগরি-২) অর্থাৎ ঢাকা মেট্রোপলিস ক্লাব কোটার ভোটার বা প্রতিনিধি (কাউন্সিলর) হিসেবে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ওল্ড ডিওএইচএস ক্রীড়াচক্রের (স্পোর্টস ক্লাব) প্রতিনিধি হিসেবে তিনি শুধু ভোটই দিচ্ছেন না, একইসঙ্গে তিনি পরিচালনা পর্ষদের একটি পরিচালক পদের জন্যও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তামিমের পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির অন্য সদস্যরাও একে একে ভোট দেন। সাবেক ক্রিকেটারদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। জাতীয় দলের সাবেক দ্রুতগতির বোলার (পেসার) রুবেল হোসেনকে সকালে বিসিবি কার্যালয়ে এসে ভোট দিতে দেখা যায়।
দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থায় এই নির্বাচনের পটভূমিটি ছিল বেশ নাটকীয়। গত বছর নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দীর্ঘ তদন্ত শেষে দেশের ক্রীড়া খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদটি ভেঙে দেয়। এর পরপরই দেশের ক্রিকেটকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে তামিম ইকবালকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের একটি শক্তিশালী অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ কমিটি (অ্যাড-হক কমিটি) গঠন করা হয়। এই কমিটির ওপর প্রধান দায়িত্ব ছিল নির্দিষ্ট ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে দেশের ক্রিকেট আইনের ধারা মেনে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা।
সমস্ত বাধা ও চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আজ এই নির্বাচন সম্পন্ন হচ্ছে। তবে এই নির্বাচনকে ঘিরে ক্রীড়াঙ্গনে বিতর্ক ও আলোচনাও কম নয়। বিভিন্ন বিভাগ বা ক্যাটাগরি থেকে একাধিক প্রার্থীর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং দেশের রাজনৈতিক মহলের সাথে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্রীড়া বিশ্লেষকেরা। সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে আশঙ্কা রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বোর্ড গঠন করা সম্ভব না হলে দেশের ক্রিকেটের সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাহত হতে পারে।
নির্বাচন পরিচালনা কমিটির তথ্যানুযায়ী, সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া এই ভোটগ্রহণ বিরতিহীনভাবে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে। এরপর ভোট গণনা সম্পন্ন করে সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করা হবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন পরিচালনা পর্ষদ আগামী চার বছরের জন্য বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করবে।
বিসিবি নির্বাচন কেবল একটি ক্রীড়া সংস্থার নেতৃত্ব বদলের আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি দেশের কোটি কোটি ক্রিকেট ভক্তের স্বপ্ন ও আবেগের সাথে জড়িত। দীর্ঘ সময় ধরে দেশের ক্রিকেটে যে প্রশাসনিক জটিলতা ও অস্থিরতা চলছিল, এই সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে তার অবসান ঘটবে—এটাই সকলের প্রত্যাশা। তবে নির্বাচিত নতুন কমিটিকে রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মাঠের ক্রিকেট ও তৃণমূল পর্যায়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নে শতভাগ মনোযোগী হতে হবে। তবেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ আবার তার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারবে।