চাঁদপুরের হাইমচরে মেঘনা নদীর পাড়ে অবৈধ খনন যন্ত্র (ড্রেজিং মেশিন) দিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ পরিস্থিতি। প্রভাবশালী মহলের সীমাহীন লোভের বলি হয়ে নদী তীর সংরক্ষণ বাঁধের প্রায় এক হাজার মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, যার ফলে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে বিস্তীর্ণ জনপদ ও গুরুত্বপূর্ণ সেচ প্রকল্প।
চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার গাজীনগর এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে এই ধ্বংসাত্মক ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জলোচ্ছ্বাসে নয়, বরং একদল অসাধু মানুষের রাতের আঁধারে বালু চুরির কারণেই এই বিপর্যয়। যে স্থানে এক সময় বিশাল বালুর মাঠ ও সবুজ ফসলি জমি ছিল, সেখানে এখন ড্রেজিংয়ের গভীর ক্ষত হয়ে আস্ত একটি দিঘি বা বড় জলাশয়ের রূপ নিয়েছে। এর প্রভাবে নদী তীরের সিসি ব্লক (সিমেন্ট ও বালুর তৈরি ভারি ব্লক) ও পাশের ফসলি জমি হুড়মুড় করে নদীগর্ভে ধসে পড়ছে।
বর্ষা মৌসুম দরজায় কড়া নাড়ছে। প্রতি বছর বর্ষায় মেঘনার বুক চিরে যে তীব্র স্রোত প্রবাহিত হয়, তা মোকাবিলা করার মতো শক্তি এখন আর এই ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের নেই। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, বর্ষার পানি বাড়ার আগেই যদি স্থায়ী সংস্কার না করা হয়, তবে গাজীনগরসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা মানচিত্র থেকে মুছে যেতে পারে। যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ড সাময়িকভাবে কিছু ব্লক ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে, তবে স্থানীয়রা একে আইওয়াশ (লোক দেখানো কাজ) বলে অভিহিত করে স্থায়ী ও মজবুত বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
অত্র এলাকার বিশিষ্টজন খোরশেদ আলম কোতোয়াল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ২০০৩ সাল থেকে কয়েক দফার চেষ্টায় চাঁদপুর সেচ প্রকল্প ও তীর সংরক্ষণ বাঁধের মাধ্যমে এই জনপদকে রক্ষা করা হয়েছিল। কিন্তু একদল অপরাধীর ব্যক্তিস্বার্থের কাছে আজ হাজার কোটি টাকার সরকারি সম্পদ ও সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল ধ্বংসের মুখে। তিনি দ্রুত সরকারের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনা নিয়ে বইছে সমালোচনার ঝড়। উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম সফিক একে সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ বাধাগ্রস্ত করার একটি গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন। তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, যারা এই অপকর্মের সাথে জড়িত, তাদের পরিচয় যাই হোক না কেন, দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তৎপরতা শুরু হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হচ্ছে এবং আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ব্লক ডাম্পিং করা হচ্ছে। আইনগত ব্যবস্থা হিসেবে হাইমচর থানায় মনির হোসেন জুয়েলকে প্রধান আসামি করে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ অভিযান চালিয়ে ইতিমধ্যে ৫ জনকে গ্রেফতার করলেও মূল হোতা জুয়েল এখনো পলাতক রয়েছে।
নদী ভাঙনপ্রবণ চাঁদপুরে একটি বাঁধ রক্ষা করা কতটুকু ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ কাজ, তা সংশ্লিষ্ট সবাই জানেন। অথচ কতিপয় বালু খেকোর দৌরাত্ম্যে সেই অমূল্য সম্পদ চোখের পলকে হারিয়ে যাচ্ছে। শুধুমাত্র মামলা বা সাময়িক ব্লক ফেলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। যতক্ষণ না বালু উত্তোলনের নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের সমূলে উৎপাটন করা যাচ্ছে, ততক্ষণ চাঁদপুরের এই মানচিত্র রক্ষা করা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে।