সোমবার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে চতুর্থ দিনের সকালে এক অন্যরকম স্নায়ুচাপ নিয়ে মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ। আগের দিনের বিনা উইকেটে ৭ রান নিয়ে দিন শুরু করা স্বাগতিকদের মূল লক্ষ্য ছিল একটি বড় রানের পাহাড় গড়ে তোলা, যাতে শেষ পর্বে (ইনিংস) পাকিস্তানি ব্যাটারদের চাপে ফেলা যায়। কিন্তু সকালের মিষ্টি রোদে খেলা শুরু হতে না হতেই স্বাগতিক শিবিরে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। দেশের ক্রিকেটে উদ্বোধনী খেলোয়াড়দের ধারাবাহিক ব্যর্থতার যে পুরোনো রোগ, এই ম্যাচেও তা প্রবলভাবে ফুটে ওঠে।
দলীয় সংগ্রহ যখন মাত্র ১৫ রান, ঠিক তখনই পাকিস্তানি পেসার মোহাম্মদ আব্বাসের নিখুঁত নিশানার একটি ডেলিভারি সোজা আঘাত হানে তরুণ ব্যাটার মাহমুদুল হাসান জয়ের পায়ের প্যাডে। আম্পায়ারের আঙুল উঠতে একটুও সময় লাগেনি। পায়ের প্যাডে বল লাগার ফাঁদে (এলবিডব্লিউ) পড়ে মাত্র ৫ রান করেই সাজঘরে ফিরতে হয় জয়কে। উল্লেখ্য, প্রথম পর্বেও তিনি মাত্র ৮ রান করে দলকে হতাশ করেছিলেন।
জয়ের বিদায়ের পর দলের চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন আরেক উদ্বোধনী খেলোয়াড় সাদমান ইসলাম। কিন্তু তিনিও আস্থার প্রতিদান দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। দলীয় ২৩ রানের মাথায় ডানহাতি পেসার হাসান আলীর করা একটি বল পিচ থেকে হঠাৎ অতিরিক্ত লাফিয়ে ওঠে (এক্সট্রা বাউন্স)। অপ্রত্যাশিত এই বলটি সামলাতে না পেরে বিভ্রান্ত হন সাদমান। বল তার ব্যাটের কানা ছুঁয়ে চলে যায় গালি অঞ্চলে (মাঠের অফ সাইডের একটি নির্দিষ্ট জায়গা) দাঁড়িয়ে থাকা ফিল্ডার সৌদ শাকিলের বিশ্বস্ত হাতে। সাদমানের ইনিংস শেষ হয় মাত্র ১০ রানে। প্রথম পর্বেও তিনি ১৩ রানের বেশি করতে পারেননি। মাত্র ২৩ রানে দুই ওপেনারকে হারিয়ে রীতিমতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ।
ঠিক সেই কঠিন মুহূর্তেই দলের ত্রাতা হয়ে ২২ গজে আবির্ভূত হন বর্তমান অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত এবং দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যাটার মুমিনুল হক। শুরুতেই দুই সতীর্থকে হারিয়ে দল যখন চরম দিশেহারা, তখন এই দুজন অত্যন্ত সতর্কতা ও ধৈর্যের সাথে ব্যাট চালাতে শুরু করেন। পাকিস্তানি পেসারদের আক্রমণাত্মক বোলিং এবং ফিল্ডারদের মানসিক চাপ তারা অসীম দক্ষতায় সামলে নেন। প্রতিটি বল তারা বিচার-বিশ্লেষণ করে খেলেছেন এবং বাজে বল পেলে সীমানাছাড়া করতেও ভুল করেননি।
খেলার প্রথম সেশনে (অংশ) মোট ২৮ দশমিক ১ ওভার খেলা হয়েছে। এই পুরোটা সময় শান্ত এবং মুমিনুল নিজেদের মধ্যে দারুণ বোঝাপড়ার মাধ্যমে দলের চাকা সচল রেখেছেন। মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে (লাঞ্চ) যাওয়ার আগে তারা দুজনে মিলে অবিচ্ছিন্ন ৭০ রানের একটি অত্যন্ত কার্যকরী জুটি গড়ে তোলেন। বিরতিতে যাওয়ার আগে অধিনায়ক শান্ত ৩৪ রানে এবং মুমিনুল হক ৩৭ রানে অপরাজিত ছিলেন। তাদের এই দায়িত্বশীল লড়াইয়ের সুবাদে মধ্যাহ্নভোজের বিরতি পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট অগ্রগামিতা দাঁড়িয়েছে ১২০ রানে।
প্রসঙ্গত, মিরপুর টেস্টের তৃতীয় দিন শেষে ৩৪ রানের লিড নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল বাংলাদেশ। প্রথম পর্বে স্বাগতিকদের ৪১৩ রানের বিশাল সংগ্রহের জবাবে পাকিস্তান দল ৩৮৬ রানে গুটিয়ে যায়। বোলারদের দারুণ নৈপুণ্যে প্রথম পর্ব শেষে ২৭ রানের এক অমূল্য অগ্রগামিতা পেয়েছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। সেই পুঁজিকে কাজে লাগিয়েই এখন পাকিস্তানকে বড় লক্ষ্যমাত্রা ছুঁড়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ দল।
টেস্ট ক্রিকেটে ধৈর্য এবং মানসিক দৃঢ়তাই হলো সফলতার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি। উদ্বোধনী ব্যাটারদের ধারাবাহিক ব্যর্থতা নিঃসন্দেহে দলের জন্য একটি বড় চিন্তার কারণ, যা টিম ম্যানেজমেন্টকে দ্রুত সমাধান করতে হবে। তবে শুরুর প্রবল চাপ সামলে শান্ত ও মুমিনুলের এই জুটি প্রমাণ করেছে যে, উইকেটে টিকে থাকার মানসিকতা থাকলে যেকোনো পরিস্থিতি থেকেই ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। মিরপুরের পিচ সময়ের সাথে সাথে স্পিনারদের জন্য ভয়ংকর হয়ে ওঠে। তাই এই জুটি যদি চা-বিরতি পর্যন্ত দলের স্কোরবোর্ডকে টেনে নিয়ে যেতে পারে এবং পাকিস্তানের সামনে অন্তত আড়াইশ বা তিনশ রানের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিতে পারে, তবে এই ম্যাচে বাংলাদেশের জয় সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। এখন পুরো দেশের নজর এই দুই লড়াকু ব্যাটারের দিকে।