পঞ্চম ও শেষ দিনে মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে জমে উঠেছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার লড়াই। ড্রয়ের পথে না হেঁটে জয়ের জন্য সফরকারীদের ২৬৮ রানের চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্য ছুঁড়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ইনিংসের প্রথম ওভারেই তাসকিন আহমেদের তোপে উইকেট হারিয়ে ভীষণ চাপে পড়েছে পাকিস্তান; ফলে শেষ দুই সেশনে জয়ের জন্য স্বাগতিকদের প্রয়োজন আর মাত্র ৯টি উইকেট।
চতুর্থ দিনের অনেকটা সময় বৃষ্টিতে নষ্ট হওয়ায় মিরপুর টেস্ট নিষ্প্রাণ ড্রয়ের দিকেই এগোচ্ছে বলে ধারণা করেছিলেন অনেকেই। কিন্তু পঞ্চম দিনের সকালে বদলে যায় সব হিসাব-নিকাশ। আগের দিনের ৩ উইকেটে ১৫২ রান নিয়ে পঞ্চম দিনের খেলা শুরু করে বাংলাদেশ। দ্রুত রান তুলে প্রতিপক্ষকে ব্যাটিংয়ে পাঠানোর সুস্পষ্ট কৌশল নিয়ে এদিন মাঠে নামেন দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান নাজমুল হোসেন শান্ত এবং অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম।
তবে দিনের শুরুতেই ধাক্কা খায় স্বাগতিকরা। রানের গতি বাড়ানোর তাড়নায় হাসান আলির অফ স্টাম্পের বাইরের বল তুলে মারতে গিয়ে শান মাসুদের হাতে সহজ ক্যাচ দিয়ে বসেন মুশফিক। আউট হওয়ার আগে ৩৭ বলে চারটি চারের সাহায্যে ২২ রান করেন তিনি। এরপর ক্রিজে আসেন উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান লিটন দাস। শুরু থেকেই আগ্রাসী মেজাজে খেলতে থাকা লিটন একটি এলবিডব্লিউ (লেগ বিফোর উইকেট) সিদ্ধান্তে আম্পায়ার আউট দিলে সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার (রিভিউ) আবেদন করে বেঁচে যান। তবে সেই স্বস্তি খুব বেশিক্ষণ টেকেনি। শাহিন শাহ আফ্রিদির বলে সীমানার বাইরে বল পাঠাতে গিয়ে পুল শট খেলেন লিটন, কিন্তু বল ব্যাটের কানায় লেগে ফাইন লেগে থাকা ফিল্ডারের হাতে জমা পড়ে। ২৮ বলে ১১ রান করে সাজঘরে ফেরেন তিনি।
অন্যদিকে, এক প্রান্ত আগলে রেখে দারুণ সাবলীল ভঙ্গিতে ব্যাট করছিলেন অধিনায়ক শান্ত। ক্যারিয়ারে তৃতীয়বারের মতো টেস্টের দুই ইনিংসে শতক (সেঞ্চুরি) হাঁকানোর দারুণ এক সুযোগ ছিল তাঁর সামনে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ব্যক্তিগত ৮৭ রানে নোমান আলির বলে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে বলের লাইন মিস করে আউট হন তিনি। এই আউটের মধ্য দিয়ে শেষ হয় তাঁর ১৫০ বলের একটি ধৈর্যশীল ও দুর্দান্ত ইনিংস, যেখানে ছিল সাতটি দৃষ্টিনন্দন চারের মার।
অধিনায়কের বিদায়ের পর মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাসকিন আহমেদ দ্রুত কিছু রান যোগ করার চেষ্টা করেন। মিরাজ ২৭ বলে ২৪ রান করে নোমান আলির স্পিনে পরাস্ত হয়ে স্লিপে ক্যাচ দেন। এই উইকেট শিকারের মধ্য দিয়ে নিজের টেস্ট ক্যারিয়ারে শততম উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন পাকিস্তানি এই বাঁহাতি স্পিনার। শেষদিকে তাসকিন আহমেদ ক্রিজে নেমেই ছক্কা হাঁকান এবং ৫ বলে ১১ রান করে আউট হন। ৭০.৩ ওভারে দলের রান যখন ৯ উইকেটে ২৪০, তখনই সাহসিকতার সঙ্গে ইনিংস ঘোষণা (ডিক্লেয়ার) করেন বাংলাদেশ অধিনায়ক শান্ত। প্রথম ইনিংসের লিডসহ সব মিলিয়ে পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৬৮ রানের এবং অলআউট করার জন্য বোলারদের হাতে সময় থাকে ৭৬ ওভার।
মধ্যাহ্নভোজের (লাঞ্চ) বিরতির ঠিক আগে বল করার জন্য মাত্র ১৫ মিনিট সময় পেয়েছিল বাংলাদেশ। আর এই ছোট্ট সুযোগেই বল হাতে আগুন ঝরান অভিজ্ঞ পেসার তাসকিন আহমেদ। ইনিংসের প্রথম ওভারেই তাঁর দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে বিভ্রান্ত হন পাকিস্তানি ওপেনার ইমাম-উল-হক। অফ স্টাম্পের কিছুটা বাইরে পড়ে বেরিয়ে যাওয়া বলটি ঠিকমতো খেলতে না পারায় ব্যাটের কানা ছুঁয়ে সোজা জমা পড়ে উইকেটরক্ষক লিটন দাসের গ্লাভসে। মাত্র ২ রান করেই সাজঘরে ফেরেন এই বাঁহাতি ওপেনার। মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে যাওয়ার আগে পাকিস্তানের সংগ্রহ দাঁড়ায় ১ উইকেটে ৬ রান। ক্রিজে অপরাজিত আছেন আজান আওয়াইজ ও আব্দুল্লাহ ফাজাল।
নিরাপদ পথে হেঁটে ম্যাচটি সহজেই ড্র করতে পারত বাংলাদেশ। কিন্তু ড্রয়ের চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রেখে জয়ের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ার যে মানসিকতা নাজমুল হোসেন শান্তর দল দেখিয়েছে, তা আধুনিক ক্রিকেটের আগ্রাসী মনোভাবেরই প্রতিফলন। পাকিস্তানের মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান সালমান আলি আঘা আগের দিন বলেছিলেন, এমন লক্ষ্য ছুঁড়ে দিতে হলে বাংলাদেশকে অনেক বেশি সাহসী হতে হবে। মাঠের ক্রিকেটে সেই সাহসিকতারই চূড়ান্ত প্রমাণ দিল স্বাগতিকরা। এখন মিরপুরের স্পিন সহায়ক উইকেটে শেষ দুই সেশনে পাকিস্তানের বাকি ৯টি উইকেট তুলে নেওয়া বোলারদের জন্য কঠিন পরীক্ষা হলেও মোটেও অসম্ভব নয়। হারার ভয় না করে জয়ের জন্য এই ইতিবাচক মানসিকতাই হয়তো সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এখন দেখার বিষয়, তাসকিন-মিরাজরা এই সাহসী সিদ্ধান্তের যথাযথ প্রতিদান দিয়ে মিরপুরের মাটিতে একটি ঐতিহাসিক জয় উপহার দিতে পারেন কি না।