টানা বৃষ্টি আর রানপ্রসবা উইকেটের কারণে মিরপুর টেস্টের ভাগ্য ক্রমশ নিষ্ফলা ড্রয়ের (ফলাফল শূন্য) দিকে এগোলেও, চতুর্থ দিন শেষে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে স্বাগতিক বাংলাদেশ দল। প্রথম ইনিংসের দুর্দান্ত নৈপুণ্যের পর দ্বিতীয় ইনিংসেও ব্যাট হাতে আলো ছড়িয়েছেন নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুমিনুল হক। একইসঙ্গে টেস্ট ক্রিকেটের দীর্ঘ ইতিহাসে পাঁচ হাজার রানের অভিজাত ক্লাবে প্রবেশ করে দিনটিকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য স্মরণীয় করে রেখেছেন দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ব্যাটার (ব্যাটসম্যান) মুমিনুল।
দীর্ঘক্ষণ আকাশভাঙা বৃষ্টি আর ব্যাটারদের নিরঙ্কুশ দাপটে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের এই টেস্ট ম্যাচটির ভাগ্য অনেকটাই ড্রয়ের দিকে হেলে পড়েছে। পঞ্চম ও শেষ দিনে জাদুকরী কোনো মুহূর্ত তৈরি না হলে ম্যাচের চূড়ান্ত ফলাফল নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভাবনা বেশ ক্ষীণ বলেই মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা। তবে এমন নিরস পরিস্থিতিতেও চতুর্থ দিন শেষে নিজেদের অবস্থান বেশ শক্ত করেছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ৩ উইকেট হারিয়ে ১৫২ রান তুলে দিনের খেলা শেষ করেছে টাইগাররা। প্রথম ইনিংসের ২৭ রানের ব্যবধানসহ বর্তমানে তাদের লিড (এগিয়ে থাকার রান) দাঁড়িয়েছে ১৭৯ রানে।
প্রথম ইনিংসে দুর্দান্ত এক শতক হাঁকিয়ে দর্শকদের মন জয় করা নাজমুল হোসেন শান্ত দ্বিতীয় ইনিংসেও নিজের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন। দিন শেষে ৫৮ রানে অপরাজিত আছেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। তার দায়িত্বশীল ব্যাটিং দলের রানকে একটি সম্মানজনক জায়গায় নিয়ে যেতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তার সঙ্গে ১৬ রান নিয়ে অপরাজিত থেকে মাঠ ছেড়েছেন দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম। পঞ্চম ও শেষ দিনে বাংলাদেশ যদি দ্রুত রান তুলে আড়াইশ বা ২৮০ রানের মতো একটি নিরাপদ লক্ষ্যমাত্রা দাঁড় করিয়ে ইনিংস ঘোষণা করতে পারে এবং স্বাগতিক বোলাররা যদি অবিশ্বাস্য কোনো বোলিং আক্রমণ উপহার দিয়ে
পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ দ্রুত ধসিয়ে দিতে পারেন, তবে নাটকীয় কোনো জয় আসলেও আসতে পারে।
বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং লাইনআপে আস্থার অন্যতম বড় প্রতিশব্দ মুমিনুল হক। দলের চরম বিপর্যয়ে মাটি কামড়ে পড়ে থেকে ইনিংস মেরামত করার যে দারুণ ক্ষমতা তার রয়েছে, পাকিস্তানের বিপক্ষে চলতি এই টেস্টেও তার ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। প্রথম ইনিংসে মাত্র ৯ রানের আক্ষেপ নিয়ে ৯১ রানে আউট হলেও, দ্বিতীয় ইনিংসে ঠিকই অর্ধশতকের দেখা পেয়েছেন তিনি। এটি তার খেলোয়াড়ি জীবনের ২৭তম অর্ধশতক এবং টানা পাঁচ ইনিংসে পঞ্চাশ পেরোনোর এক অনন্য কীর্তি।
অর্ধশতক পূরণের পাশাপাশি এদিন মিরপুরে এক অভাবনীয় ব্যক্তিগত মাইলফলক স্পর্শ করেছেন মুমিনুল। বাংলাদেশের তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে ক্রিকেটের আদি সংস্করণ টেস্টে পাঁচ হাজার রানের অভিজাত ঘরে পা রেখেছেন তিনি। ১২০ বল মোকাবিলা করে ৫৬ রানের একটি ধৈর্যশীল ইনিংস খেলার পর শাহিন শাহ আফ্রিদির বলে উইকেটরক্ষক মোহাম্মদ রিজওয়ানের হাতে ক্যাচ (ধরা পড়া) দিয়ে সাজঘরে ফেরেন তিনি। তার এই বিদায়ে দল একটি বড় জুটি হারালেও, নামের পাশে লেখা হয়ে যায় অনন্য ইতিহাস।
মুমিনুলের আগে এই বিরল মাইলফলক স্পর্শ করার সৌভাগ্য হয়েছে কেবল দুজন বাংলাদেশি ক্রিকেটারের। তারা হলেন দলের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল এবং অভিজ্ঞ ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম। পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, তামিম ইকবাল ৭০টি ম্যাচের ১৩৪ ইনিংসে ৩৮ গড়ে ৫ হাজার ৩১৪ রান করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ৩১টি অর্ধশতক ও ১০টি শতক। অন্যদিকে, এই তালিকার সবার শীর্ষে বীরদর্পে অবস্থান করছেন মুশফিকুর রহিম। ১০১ টেস্টের ১৮৫ ইনিংসে ৩৮ গড়ে তার মোট সংগ্রহ ৬ হাজার ৫৮১ রান। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ৩০টি অর্ধশতক ও ১৩টি শতকের পাশাপাশি রয়েছে ৩টি দ্বিশতক (ডাবল সেঞ্চুরি), যা বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে কোনো উইকেটরক্ষকের জন্য সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড।
এর আগে, দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের শুরুটা খুব একটা ভালো হয়নি বাংলাদেশের। দলীয় স্কোরে খুব বেশি রান যোগ হওয়ার আগেই মাত্র ৫ রানে মাহমুদুল হাসান জয় এবং ১০ রানে সাদমান ইসলাম আউট হয়ে সাজঘরে ফিরে গেলে কিছুটা চাপে পড়ে দল। তবে সেই চাপ সামলে নেন শান্ত ও মুমিনুল।
উল্লেখ্য, ঢাকা টেস্টের প্রথম ইনিংসে টসে হেরে শুরুতে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ ৪১৩ রানের বিশাল সংগ্রহ দাঁড় করিয়েছিল। জবাবে পাকিস্তান তাদের প্রথম ইনিংসে ৩৮৬ রানে গুটিয়ে যায়, যার ফলে ২৭ রানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লিড (এগিয়ে থাকার সুবিধা) পেয়েছিল বাংলাদেশ।
ঢাকা টেস্টের বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের একটি নিরেট বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়— ক্রিকেটের এই রাজকীয় সংস্করণে বোলারদের জন্য খেলার মাঠে যদি ন্যূনতম সাহায্য না থাকে, তবে ফলাফল বের করে আনা কতটা দুরূহ। বৃষ্টি এবং রানপ্রসবা উইকেটের কারণে ম্যাচটি হয়তো ড্রয়ের দিকেই এগোচ্ছে, তবে মুমিনুলের ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জন আর শান্তর অনবদ্য ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য নিঃসন্দেহে এক বিশাল প্রাপ্তি। এখন পুরো দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর পঞ্চম দিনের সকালের দিকে। বাংলাদেশ কি নিরাপদ পথে হেঁটে একটি নিষ্প্রাণ ড্র মেনে নেবে, নাকি আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলে জয়ের জন্য ঝুঁকি নিয়ে একটি রোমাঞ্চকর সমাপ্তির জন্ম দেবে? টেস্ট ক্রিকেটের আসল সৌন্দর্য ও নাটকীয়তা তো ঠিক এখানেই নিহিত!