মাঠের বাইরের চরম বিতর্ক আর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের উপযুক্ত জবাব সবুজ গালিচাতেই দিল বেলজিয়াম। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর (রাউন্ড অব সিক্সটিন) হাইভোল্টেজ ম্যাচে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে ‘রেড ডেভিলস’ (বেলজিয়াম ফুটবল দল)। এই জয়ে কেবল টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার-ফাইনালে ওঠার টিকিটই পেল না বেলজিয়াম, সেই সাথে ম্যাচের আগে গত দুদিন ধরে চলা নানা আলোচনা-সমালোচনা এবং ফিফার পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ মাঠের পারফরম্যান্সেই দেখাল তারা।
সিয়াটলের মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে বেলজিয়ামের বিশাল জয় নিশ্চিত করেন তাদের তারকা স্ট্রাইকার (আক্রমণভাগের খেলোয়াড়) রোমেলু লুকাকু। ম্যাচের শেষ গোলটি করার পর নাপোলির এই ফরোয়ার্ড যেন সব ক্ষোভ উগড়ে দেন। মার্কিন গ্যালারিকে স্তব্ধ করে দিয়ে তিনি মেতে ওঠেন বাধভাঙা ও কিছুটা উসকানিমূলক উল্লাসে। এরপর তিনি যা করলেন, তা দীর্ঘদিন ফুটবল বিশ্বে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। লুকাকু মাঠেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিখ্যাত নাচের ভঙ্গি নকল করে পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন।
আসলে এই প্রতিবাদের সূত্রপাত হয়েছিল ম্যাচের আগেই। আগের ম্যাচে লাল কার্ড পাওয়া মার্কিন ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের ওপর থেকে স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে ফিফাকে অনুরোধ করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, বালোগুনকে খেলানোর জন্য তিনি ফিফার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েছেন। ফিফাও নতি স্বীকার করে বালোগুনকে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে খেলার অনুমতি দেয়।
ফিফার এই পক্ষপাতমূলক আচরণে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল বেলজিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। তারা অভিযোগ তোলে, ফিফা তথ্য গোপন করেছে এবং ম্যাচ-পূর্ববর্তী সভার নিয়মাবলি থেকে স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞার ধারাটি ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিয়েছে। তারা আগেই ঘোষণা দিয়েছিল, বালোগুনকে খেলানো হলে তারা আইনি ব্যবস্থা নেবে। সিয়াটলের মাঠে হালকা নীল ও গোলাপি রঙের জার্সি পরা বেলজিয়াম দল তাই এই ম্যাচটিকে মর্যাদার লড়াই হিসেবে নিয়েছিল।
ডান পায়ের বাঁকানো এক দর্শনীয় শটে বল জালে জড়িয়েই লুকাকু সিয়াটলের দর্শকদের সামনে দুই হাত কানের পেছনে নিয়ে ‘টোপো জিজিও’ (এক বিশেষ ধরণের অবজ্ঞাসূচক শারীরিক ভঙ্গি) অঙ্গভঙ্গি করেন। এরপর তিনি ভিআইপি বক্সে (বিশেষ অতিথি গ্যালারি) বসা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোর দিকে রাগান্বিত চোখে আঙুল উঁচিয়ে চিৎকার করেন। সবশেষে সতীর্থদের মাঝে দাঁড়িয়ে ট্রাম্পের সেই বিখ্যাত ‘ওয়াইএমসিএ’ (এক জনপ্রিয় ইংরেজি গান) গানের নাচের ভঙ্গি করেন। স্পষ্টতই, মাঠের বাইরের এই বিতর্কই ইউরোপের রেড ডেভিলসদের বাড়তি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
প্রভাব খাটিয়ে বালোগুনকে মাঠে নামানো হলেও মার্কিন আক্রমণভাগ বেলজিয়ামের রক্ষণভাগ ভাঙতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং ফিফার নতি স্বীকার করার মনোভাব বিশ্ব ফুটবলের নিরপেক্ষতাকে কলঙ্কিত করেছে। তবে বেলজিয়ামের ফুটবলাররা মাঠেই তার দাঁতভাঙা জবাব দিলেন। ম্যাচ শেষে বেলজিয়ান কোচ বলেন, "আমাদের প্রতি অন্যায় করা হয়েছিল, কিন্তু ছেলেরা মাঠেই তার উপযুক্ত জবাব দিয়েছে। ফুটবল কোনো রাজনৈতিক শক্তি দিয়ে চলে না, এটি খেলে জয়ী হতে হয়।"
এদিকে প্রতিবাদের পাশাপাশি দলে তৈরি হয় আবেগঘন এক পরিবেশ। প্রথমার্ধেই বেলজিয়ামের মিডফিল্ডার আমাদু ওনানা হাঁটুতে মারাত্মক চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন। গোল করার পর ইন্টার মিলানের সাবেক তারকা লুকাকু ওনানার জার্সি উঁচিয়ে ধরেন এবং এই জয় সতীর্থকে উৎসর্গ করেন। ৪-১ গোলের এই জয়ে বেলজিয়াম প্রমাণ করল, মাঠের বাইরের শত চাপ আর বিতর্কের পরও ফুটবল খেলায় পারফরম্যান্সই শেষ কথা বলে।