বিশ্বফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দলের নাম নিতে গেলেই সবার আগে মনে আসে ব্রাজিলের নাম। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন সেলেসাওরা (ব্রাজিল ফুটবল দল) ফুটবলের মহাযজ্ঞে বরাবরই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে। বিশ্বকাপের সরাসরি বিদায় পর্বে (নকআউট) সর্বোচ্চ ১৩ বার জায়গা করে নেওয়ার অনন্য রেকর্ডটিও হলুদ শিবিরের দখলে। তবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের সেই একক আধিপত্যের সাম্রাজ্যে এবার ভাগ বসাতে দ্রুত এগিয়ে চলেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ ৩২ দলের জমজমাট লড়াইয়ে কেপ ভার্দেকে ৩-২ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করেছে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। স্নায়ুক্ষয়ী এই জয়ের মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক আসরে ১১তমবারের মতো শেষ ১৬ দলের পর্বে ওঠার গৌরব অর্জন করল আলবিসেলেস্তেরা (আর্জেন্টিনা ফুটবল দল)।
অন্য এক ম্যাচে এশিয়ার পরাশক্তি জাপানকে ২-১ গোলে হারিয়ে নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে ব্রাজিল। এই জয়ের মাধ্যমে তারা রেকর্ড ১৩তমবারের মতো শেষ ষোলোর মঞ্চে নিজেদের স্থান পাকাপোক্ত করল। ফলে বিশ্বমঞ্চের সরাসরি বিদায় পর্বে ওঠার এই লড়াইয়ে দুই লাতিন পরাশক্তির ব্যবধান এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র দুটি আসরের।
চলমান আসরে ইউরোপীয় জায়ান্ট স্পেনও দুর্দান্ত খেলেছে। প্যারাগুয়েকে হারিয়ে তারা দশমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিয়েছে। তবে ফুটবল ভক্তদের বড় ধাক্কা দিয়েছে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি। নাটকীয় এক ম্যাচে প্যারাগুয়ের কাছে হেরে শেষ ৩২-এর পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে জার্মানদের। ফলে বিশ্বকাপে রেকর্ড ১০ বার শেষ ষোলোতে ওঠার নিজেদের আগের রেকর্ডেই আটকে থাকতে হলো তাদের।
বিশ্বকাপের গৌরবময় ইতিহাসে আর্জেন্টিনার ধারাবাহিকতা অত্যন্ত ঈর্ষণীয়। বিগত বহু আসরের মধ্যে নীল-আকাশি জার্সিধারীরা মাত্র একবারই গ্রুপ পর্ব (প্রাথমিক পর্ব) থেকে বিদায় নিয়েছিল। ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান যৌথ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের বাধা টপকাতে ব্যর্থ হয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেই হতাশার পর থেকে প্রতিটি আসরেই শেষ ষোলোর লড়াইয়ে নিজেদের নিয়মিত উপস্থিতি বজায় রেখেছে তারা।
পরিসংখ্যানের বিচারে ব্রাজিলের তুলনায় আর্জেন্টিনার কিছুটা পিছিয়ে থাকার পেছনে ঐতিহাসিক কিছু কারণও রয়েছে। ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ব্রাজিল সেই আসরে অংশ নিয়ে নকআউট পর্বে উঠেছিল। সেই সময়ে তৈরি হওয়া ব্যবধানটিকেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এবং ধারাবাহিক সাফল্যের মধ্য দিয়ে দ্রুত কমিয়ে আনছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের এই তুমুল লড়াই মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে এখন পরিসংখ্যানের পাতাতেও এসে ঠেকেছে। লাতিন আমেরিকার এই দুই পরাশক্তির দ্বৈরথ সবসময়ই ফুটবল বিশ্বকে আন্দোলিত করে। মাঠের খেলায় কে সেরা, তা নিয়ে তর্ক-বিতর্কের শেষ না থাকলেও দলগত অর্জনে কেউ কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ। ব্রাজিলের একক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে আর্জেন্টিনা যেভাবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে চলেছে, তা বিশ্ব ফুটবলের সৌন্দর্যকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, আর্জেন্টিনার এই অপ্রতিরোধ্য গতি অব্যাহত থাকলে আগামী আসরগুলোতে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর এই ব্যবধান আরও সংকুচিত হয়ে আসবে।