ইনিংসের শুরুতেই উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়লেও নাজমুল হোসেন শান্ত এবং তানজিদ হাসান তামিমের আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী বোলিং আক্রমণকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রথম পাওয়ার প্লে-তেই (শুরুর নির্দিষ্ট ওভার, যেখানে ফিল্ডিংয়ের সীমাবদ্ধতা থাকে) বড় সংগ্রহের ভিত গড়ে তুলেছে এই আত্মবিশ্বাসী জুটি।
অস্ট্রেলিয়ার মতো বিশ্বমানের ও শক্তিশালী দলের বিপক্ষে মাঠে নামা মানেই সব সময় বাড়তি এক স্নায়ুর চাপ। সেই চাপের মুখে ইনিংসের একদম শুরুতেই যদি উদ্বোধনী ব্যাটার সাজঘরে ফিরে যান, তবে দলের মনোবল ভেঙে পড়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মাঠের চিত্রপটে এবার দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য। শুরুর সেই ভয়াবহ ধাক্কাকে দারুণ দক্ষতায় সামাল দিয়েছেন বাংলাদেশের দুই তরুণ ও প্রতিভাবান ব্যাটার নাজমুল হোসেন শান্ত এবং তানজিদ হাসান তামিম। তাদের সাবলীল এবং একইসঙ্গে আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের ওপর ভর করে বাংলাদেশ এখন বেশ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে।
ইনিংসের প্রথম দশ ওভারের খেলা শেষ হওয়ার পর দলের সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে এক উইকেট হারিয়ে বাষট্টি রান। ২২ গজের এই লড়াইয়ে অজি বোলারদের রীতিমতো ঘাম ছুটিয়ে দিচ্ছেন এই দুই ব্যাটার। ক্রিজে (পিচের যে স্থানে ব্যাটার দাঁড়িয়ে খেলেন) অবিচল থেকে তামিম অপরাজিত আছেন একত্রিশ রান করে, অন্যদিকে তাকে যোগ্য সঙ্গ দিয়ে পঁচিশ রানে ব্যাট করছেন শান্ত। ইনিংসের চতুর্থ ওভারে এই দুই ব্যাটার ফিল্ডারদের ভুলে একবার আউট হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার সুযোগ বা ‘জীবন’ পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সুযোগ পেয়ে তারা রক্ষণাত্মক হয়ে যাননি, বরং এরপর থেকে খোলস ছেড়ে আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। নিয়মিত বিরতিতে বল সীমানাছাড়া করে তারা অস্ট্রেলিয়ার বোলিং লাইনআপকে প্রবল চাপের মুখে ফেলে দিয়েছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, ইনিংসের প্রথম পাঁচ ওভারে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ৩৪ রান। রান তোলার এই চাকা পরের পাঁচ ওভারেও সমানভাবে সচল ছিল, যেখানে তারা তুলে নেন আরও ২৮ রান। সব মিলিয়ে রান তোলার এই গতি প্রমাণ করে যে অজি বোলাররা কোনোভাবেই টাইগার ব্যাটারদের বিপাকে ফেলতে পারছেন না। উল্টো শান্ত এবং তামিমের আত্মবিশ্বাসী শটগুলো বারবার ফিল্ডারদের ফাঁকি দিয়ে সীমানার বাইরে আছড়ে পড়ছে, যা বোলারদের লাইন ও লেংথকে এলোমেলো করে দিচ্ছে।
খেলার নবম ওভারে এসে দর্শকরা ইনিংসে প্রথমবারের মতো বল শূন্যে ভাসিয়ে সীমানার বাইরে ফেলার দৃশ্য বা ছক্কার দেখা পান। তানজিদ হাসান তামিমের ব্যাট থেকে আসা এই দর্শনীয় ছক্কাটি যেন পুরো দলের আত্মবিশ্বাসকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে ঠিক পরের ওভারেও। দশম ওভারে বল করতে আসেন অস্ট্রেলিয়ার অভিষিক্ত তরুণ বোলার লিয়াম স্কট। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের প্রথম বলটি করতে এসেই তিনি শিকার হন শান্তর রুদ্ররোষের। স্কটের প্রথম বলটিতেই লং অন (মাঠের সোজা সীমানার দিকে) দিয়ে এক বিশাল ছক্কা হাঁকিয়ে তাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক কঠিন স্বাগত জানান নাজমুল হোসেন শান্ত।
অথচ দিনের শুরুটা এমন ঝলমলে ছিল না বাংলাদেশের জন্য। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই বড় এক ধাক্কা খায় স্বাগতিক দল। অস্ট্রেলিয়ার পেস বোলার নাথান এলিসের দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে সাজঘরের পথ ধরেন ওপেনার সাইফ। এলিসের ওভারের দ্বিতীয় বলটি অফ স্টাম্পের (উইকেটের বাইরের দিকের খুঁটি) কিছুটা বাইরে ফুল লেংথে (ব্যাটারের পায়ের কাছাকাছি জায়গায়) পড়েছিল। বলটি মাটিতে পড়ার পর শেষ মুহূর্তে সামান্য বাইরের দিকে বেঁকে যায়। সাইফ বলটির লাইন পুরোপুরি বুঝতে না পেরে ড্রাইভ (সামনের দিকে ঝুঁকে মারা শট) করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু বলটি তার ব্যাটের কানায় লেগে সোজা উড়ে যায় স্লিপের (উইকেটরক্ষকের ঠিক পাশের অবস্থান) দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা ফিল্ডার মার্নাস লাবুশেন ডান দিকে নিজের পুরো শরীর শূন্যে ভাসিয়ে দুই হাতে অসাধারণ ও অবিশ্বাস্য এক ক্যাচ লুফে নেন।
শুরুর সেই দুর্দান্ত ক্যাচ ও উইকেটের পতনে অস্ট্রেলিয়া হয়তো ভেবেছিল তারা ম্যাচে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে যাচ্ছে। কিন্তু শান্ত এবং তামিমের এই দায়িত্বশীল ও আগ্রাসী জুটি অজিদের সেই আশায় আপাতত জল ঢেলে দিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে।
শুরুর ধাক্কা সামলে শান্ত ও তামিম যে দৃঢ়তা দেখাচ্ছেন, তা বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল সংগ্রহের দারুণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশ্বমানের পেসারদের সামনে তাদের এই ভয়ডরহীন মানসিকতা প্রমাণ করে যে, আধুনিক ক্রিকেটে টিকে থাকতে হলে পাল্টা আক্রমণই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তবে ক্রিকেটে যেকোনো মুহূর্তে খেলার মোড় ঘুরে যেতে পারে। তাই এই দুই তরুণ ব্যাটার তাদের এই চমৎকার শুরুকে কতটা দীর্ঘ এবং কার্যকরী ইনিংসে রূপ দিতে পারবেন, তার ওপরই নির্ভর করছে এই ম্যাচের চূড়ান্ত ভাগ্য। অজিদের বিপক্ষে এই আগ্রাসী মানসিকতা ধরে রাখাই এখন টাইগারদের সামনের বড় চ্যালেঞ্জ।