দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে সংবিধান সংশোধনের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তিনি জানান, রাষ্ট্র সংস্কারের এই মহান কাজে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই নীতিগতভাবে একমত থাকলেও কেবল পদ্ধতিগত কিছু বিষয়ে আলোচনার অবকাশ রয়েছে।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনের বিরতি চলাকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে চিফ হুইপ এসব কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে বিরোধী দলের দাবির সঙ্গে সরকারের বড় কোনো বিরোধ নেই। তবে সংশোধনের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া নিয়ে কিছুটা মতপার্থক্য থাকায় বিষয়টি বর্তমানে পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা অনেক বিষয়েই ঐক্যমতে পৌঁছেছি। অনৈক্য শুধু সামান্য কিছু জায়গায়। আশা করা যায় খুব দ্রুতই সকল পক্ষ একটি অভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে এবং সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করা হবে।”
সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসার মাধ্যমে এটিই প্রমাণিত হয়েছে যে, দেশের কোনো নাগরিকই আইনের উর্ধ্বে বা জবাবদিহিতার বাইরে নন। এটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বিকল্প শ্রমবাজারের অনুসন্ধানে সরকারের তৎপরতার কথা জানিয়ে চিফ হুইপ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বারবারই দক্ষ জনশক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তার দর্শন অনুযায়ী, ‘দক্ষ মানুষের হাতই হবে আগামীর বাংলাদেশ’। এই লক্ষ্যে কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারে সরকার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে ইংরেজিকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শিক্ষিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যারা জীবিকার প্রয়োজনে বিদেশে যাবেন, তাদের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সেনাবাহিনী বা সশস্ত্র বাহিনীর ওপর বিগত সরকারের প্রভাব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে চিফ হুইপ জানান, পূর্ববর্তী সরকার সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে একে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর পেশাদার এই বাহিনীকে রাজনীতিকরণ মুক্ত করতে সব ধরনের সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, সশস্ত্র বাহিনী যদি দলীয় প্রভাবমুক্ত না থাকে, তবে তা দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনকল্যাণে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারে না।
সবশেষে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন চিফ হুইপ। তিনি ইস্টার্ন রিফাইনারি (দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার) বন্ধ হওয়ার সংবাদের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সংকটের সংবাদ যেমন গুরুত্ব পায়, তেমনি সমাধানের খবরও মানুষের কাছে পৌঁছানো উচিত। সম্প্রতি দুটি তেলবাহী জাহাজ বন্দরে আসা সত্ত্বেও তা অনেক গণমাধ্যমে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি সংবাদকর্মীদের উদ্দেশ্যে ইতিবাচক ও নেতিবাচক—উভয় ধরনের সংবাদই নিরপেক্ষভাবে প্রচার করার এবং গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
সংবিধান সংশোধনের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে ঐক্যমতের আভাস নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক। তবে রাজনীতিকরণের সংস্কৃতি থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে মুক্ত করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তার প্রতিফলন কর্মক্ষেত্রে কতটুকু ঘটে তা দেখার বিষয়। একটি আধুনিক ও কার্যকর সংবিধান এবং দক্ষ জনশক্তিই পারে একটি দেশকে প্রকৃত সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে। এই সংস্কার প্রক্রিয়া যেন কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে, সেটিই এখন বড় প্রত্যাশা।