বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে অন্যান্য দলের চেয়ে কিছুটা দেরিতেই বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করল আর্জেন্টিনা। তবে ভক্তদের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর হলো, সাম্প্রতিক চোটের শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে ২৬ সদস্যের এই দলে জায়গা করে নিয়েছেন জাদুকরী অধিনায়ক লিওনেল মেসি। প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনির এই ভারসাম্যপূর্ণ দল নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে তুমুল উন্মাদনা।
ফুটবল বিশ্বের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা অবশেষে তাদের বিশ্বকাপ লড়াইয়ের চূড়ান্ত খেলোয়াড় তালিকা প্রকাশ করেছে। একের পর এক দেশ যখন নিজেদের ঘুঁটি সাজিয়ে নিচ্ছিল, তখন আকাশী-সাদা শিবিরের সমর্থকরা কিছুটা অধৈর্য হয়ে পড়েছিলেন। বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা কেন এত দেরি করছে, তা নিয়ে ক্রীড়া অঙ্গনে চলছিল নানা জল্পনা-কল্পনা। তবে সব অপেক্ষার প্রহর ভেঙে প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি ঘোষণা করেছেন বহুল কাঙ্ক্ষিত ২৬ সদস্যের দল। আর এই দলের সবচেয়ে বড় চমক বা স্বস্তির জায়গা হলো, দলের প্রাণভোমরা ও অধিনায়ক লিওনেল মেসির সদর্পে উপস্থিতি।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ঘরোয়া লিগে নিজের ক্লাব ইন্টার মিয়ামির হয়ে মাঠে নামার পর হঠাৎ করেই চোট পান মেসি। এরপর থেকেই পুরো ফুটবল বিশ্বে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়—তবে কি আসন্ন বিশ্বকাপ মঞ্চে দেখা যাবে না এই জাদুকরকে? বয়সের কারণে চোট থেকে সেরে ওঠা নিয়ে যখন চিকিৎসকরাও কিছুটা চিন্তিত, তখন ভক্তদের সব দুশ্চিন্তা ও জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে স্কালোনি তার তুরুপের তাস হিসেবে মেসিকেই দলের নেতৃত্বে রেখেছেন।
ফুটবলপ্রেমীদের নিশ্চয়ই মনে আছে গত ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সেই অবিস্মরণীয় মহাকাব্যের কথা। দীর্ঘ ৩৬ বছরের শিরোপা-খরা কাটিয়ে আর্জেন্টিনাকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকাটি রেখেছিলেন এই মেসিই। সেই আসরে তিনি নিজের পায়ের জাদুতে ৭টি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে ৩টি গোল করিয়েছিলেন (অ্যাসিস্ট)। এবারও শিরোপা ধরে রাখার কঠিন লড়াইয়ে পুরো দেশ তাকিয়ে আছে তার জাদুকরী বাঁ পায়ের দিকে।
মূল আসরে মাঠে নামার আগে নিজেদের প্রস্তুত করতে এবং কৌশলগুলো ঝালিয়ে নিতে আর্জেন্টিনা দুটি প্রস্তুতিমূলক প্রীতি ম্যাচ খেলবে। আগামী ৬ জুন হন্ডুরাস এবং ৯ জুন আইসল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামবে তারা। এই ম্যাচগুলোর মধ্য দিয়ে কোচ স্কালোনি দলের খেলোয়াড়দের শারীরিক অবস্থা ও মাঠের বোঝাপড়া পরখ করে নেবেন। প্রস্তুতি ম্যাচ শেষে পুরো দল চলে যাবে যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটিতে। সেখানেই দলটির মূল আবাসিক শিবির (বেস ক্যাম্প) স্থাপন করা হয়েছে, যেখান থেকে তারা পুরো টুর্নামেন্ট পরিচালনা করবে।
এবারের বিশ্বকাপে 'লা আলবিসেলেস্তে' (আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের জনপ্রিয় স্প্যানিশ ডাকনাম, যার অর্থ আকাশী-সাদা) লড়বে গ্রুপ 'জে'-তে। আগামী ১৬ জুন আলজেরিয়ার বিপক্ষে একটি জমজমাট ম্যাচ দিয়ে তাদের শিরোপা ধরে রাখার নতুন অভিযান শুরু হবে। গ্রুপ পর্বে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে অস্ট্রিয়া ও জর্ডান। তুলনামূলক সহজ গ্রুপ হলেও, চ্যাম্পিয়ন হিসেবে প্রতিটি ম্যাচেই প্রতিপক্ষের কড়া নজরে থাকবে স্কালোনির শিষ্যরা।
বিশ্বকাপের জন্য ঘোষিত আর্জেন্টিনার ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত খেলোয়াড় তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
গোলরক্ষক (যাঁরা গোলবার সামলাবেন): এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, জেরোনিমো রুলি ও হুয়ান মুসো।
রক্ষণভাগ (ডিফেন্ডার): লিওনার্দো বালের্দি, গঞ্জালো মন্টিয়েল, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, নিকোলাস ওতামেন্দি, ফাকুন্দো মেদিনা ও নাহুয়েল মলিনা।
মধ্যমাঠ (মিডফিল্ডার): লেয়ান্দ্রো পারেদেস, রদ্রিগো ডি পল, ভ্যালেন্টিন বার্কো, জিওভানি লো সেলসো, এক্সেকুয়েল পালাসিওস, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজ।
আক্রমণভাগ (ফরোয়ার্ড): লিওনেল মেসি, হুলিয়ান আলভারেজ, নিকোলাস গঞ্জালেস, থিয়াগো আলমাদা, জিউলিয়ানো সিমিওনে, নিকোলাস পাজ, হোসে ম্যানুয়েল লোপেজ ও লাউতারো মার্তিনেজ।
মেসির বর্তমান বয়স এবং সাম্প্রতিক চোটের প্রবণতা বিবেচনায় এটিই হয়তো তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে। কোচ স্কালোনির ঘোষিত এই দলটিতে তারুণ্যের উদ্দামতা এবং অভিজ্ঞতার এক দারুণ মেলবন্ধন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে কাতার বিশ্বকাপের নায়ক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, ডি পল বা এনজো ফার্নান্দেজদের মতো পরীক্ষিত সৈনিকরা দলে থাকায় বেশ আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছে আর্জেন্টিনাকে। তবে বড় প্রশ্ন হলো, কাতার বিশ্বকাপের সেই অদম্য ক্ষুধা ও লড়াইয়ের মানসিকতা কি এবারও ধরে রাখতে পারবে দলটি? শিরোপা ধরে রাখার এই প্রচণ্ড মানসিক চাপ সামলে নতুন ইতিহাস গড়ার পথে মেসিদের এই যাত্রা নিশ্চিতভাবেই আগামী দিনগুলোতে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।