ফুটবল বিশ্বে এমন কিছু ম্যাচ থাকে যা কেবল ৯০ মিনিটের মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। সবুজ গালিচায় বল গড়ানোর সাথে সাথেই সেখানে প্রাণ ফিরে পায় যুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতি, রাজনৈতিক ক্ষত, প্রতিশোধের তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর কিংবদন্তিদের অমর সব আখ্যান। বিশ্ব ফুটবলে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের চিরবৈরী দ্বৈরথ ঠিক এমনই এক ক্লাসিক (অনবদ্য) উপাখ্যান, যেখানে প্রতিটি পাসের পেছনে লুকিয়ে থাকে ইতিহাস আর প্রতিটি গোলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এক একটি প্রজন্মের আবেগ।
দীর্ঘ ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে (উপ-চূড়ান্ত পর্ব) দুই দলের এই হাই-ভোল্টেজ (তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ) লড়াই মাঠের পুরোনো ক্ষতকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এবার কি নতুন কোনো রূপকথা লেখা হবে, নাকি ফিরে আসবে অতীতের সেই ইতিহাস?
মাঠের এই বৈরিতার বীজ বপন হয়েছিল ফুটবল ইতিহাসেরও আগে। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (আর্জেন্টিনায় যা মালভিনাস নামে পরিচিতপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধ দুই অঞ্চলের মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। মাত্র ৭৪ দিনের সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন। এই ভূখণ্ড আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে মাত্র ৩০০ মাইল দূরে হলেও ব্রিটিশদের দূরত্ব ছিল প্রায় ৮ হাজার মাইল। যুদ্ধে ব্রিটেনের জয়ের পর দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েন চরম আকার ধারণ করে।
এই রাজনৈতিক ক্ষোভ ফুটবল মাঠে প্রথম বিস্ফোরিত রূপ নেয় ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে (অন্তিম আট পর্ব)। মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে দিয়াগো ম্যারাডোনা একাই রচনা করেন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বিতর্কিত ও নান্দনিক ইতিহাস। প্রথমে হাত দিয়ে গোলরক্ষক পিটার শিলটনের মাথার ওপর দিয়ে বল জালে জড়িয়ে জন্ম দেন ফুটবল ইতিহাসের চিরকালীন বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ বা ‘ঈশ্বরের হাত’ গোলের। এর ঠিক পাঁচ মিনিট পর মাঝমাঠ থেকে এক অবিশ্বাস্য জাদুকরী ড্রিবলিংয়ে (বল কাটানো) পাঁচজন ইংলিশ ফুটবলার ও গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে করেন ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বা ‘শতকের সেরা গোল’। ম্যারাডোনা পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন, সেই ম্যাচটি তাদের কাছে ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত তরুণের স্মরণে এক প্রতীকী প্রতিশোধ।
বৈরিতার ইতিহাস অবশ্য ১৯৬৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালেই শুরু হয়েছিল, যখন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে বিতর্কিত লাল কার্ড দেওয়া হয় এবং ইংলিশ কোচ আলফ রামসে আর্জেন্টাইনদের ‘জানোয়ার’ বলে গালি দেন। এরপর ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপেও ডিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মেরে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড পাওয়া এবং টাইব্রেকারে (টাইব্রেকার বা ভাগ্য নির্ধারণী পেনাল্টি শ্যুটআউট) আর্জেন্টিনার জয় ইংল্যান্ডকে আরেকটি ট্র্যাজেডির স্বাদ দেয়। তবে ২০০২ বিশ্বকাপে পেনাল্টি (দণ্ডমূলক কিক) থেকে গোল করে বেকহ্যাম নিজেই সেই হারের প্রতিশোধ নেন।
দীর্ঘ ২৪ বছর পর আবারও সেই ঐতিহাসিক সেমিফাইনালে লড়াইয়ের মঞ্চ প্রস্তুত। আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠ মাতাবেন লিওনেল মেসি, আর অন্যদিকে ইংল্যান্ডের স্বপ্নসারথি জুড বেলিংহ্যাম ও হ্যারি কেইন। যদিও আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি এবং ইংলিশ কোচ থমাস টুহেল একে ‘কেবলই একটি ফুটবল ম্যাচ’ বলে দেখানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু ইতিহাসের এমন মহাকাব্যিক লড়াইয়ে অতীতকে ভুলে যাওয়া কি আদৌ সম্ভব? কারণ এই দ্বৈরথে প্রতিপক্ষ কেবল মাঠের ১১ জন খেলোয়াড় নয়, প্রতিপক্ষ স্বয়ং ইতিহাস।