দীর্ঘ দেড় দশকের লড়াই-সংগ্রাম আর ত্যাগের ফসল হিসেবে সংরক্ষিত নারী আসনে নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে মুখিয়ে আছেন বিএনপির নারী নেত্রীরা। রাজধানীর নয়াপল্টনে উৎসবমুখর পরিবেশে মনোনয়ন ফরম বিক্রির মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া, যেখানে অবহেলিত ও নির্যাতিত কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়নের দাবি উঠেছে।
শনিবার (১১ এপ্রিল) রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দ্বিতীয় দিনের মতো সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের ধুম লেগেছে। তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত নারী নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখরিত এখন নয়াপল্টন এলাকা। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গতকাল শুক্রবার প্রথম দিনেই ৫৭৮টি ফরম বিক্রি হয়েছে। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের দীর্ঘ তালিকায় রয়েছেন নামী চিকিৎসক, আইনজীবী, শিল্পী এবং সাবেক ছাত্রনেত্রীরা।
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ মে সংরক্ষিত নারী আসনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এই প্রক্রিয়ায় বিএনপি জোট ৩৬টি এবং জামায়াতে ইসলামী জোট ১৩টি আসন পাওয়ার কথা রয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশে রাজপথের পরীক্ষিত সৈনিকদের আইনসভায় পাঠানোর এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
মনোনয়ন ফরম বিতরণের সময় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী জানান, প্রার্থীর অতীত আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, রাজনৈতিক দক্ষতা এবং সংসদে কথা বলার পারদর্শিতা বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে দল। রাজপথের লড়াইয়ে যারা পুলিশের লাঠিচার্জ কিংবা জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন, তাঁদের প্রতি দলের বিশেষ নজর থাকবে।
মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে আসা সাবেক মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মেয়ে ডা. খোন্দকার আকতারা খাতুন লুনা বলেন, পারিবারিকভাবেই তাঁরা জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী। দলের ক্রান্তিকালে তাঁরা পাশে ছিলেন এবং ভবিষ্যতেও তারেক রহমানের নেতৃত্বে এগিয়ে যেতে চান। অন্যদিকে, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি তাঁর পরিবারের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, বিগত সরকারের আমলে তাঁদের পরিবারকে চরম নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। শহীদ নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বোন হিসেবে তিনি দলের হয়ে কাজ করার সুযোগ চান।
নির্যাতিত নেত্রীদের মধ্যে অন্যতম আরিফা সুলতানা রুমা বলেন, এক-এগারোর সময় থেকে শুরু করে ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলনে তিনি মাঠে ছিলেন। দলের হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারলে তিনি তৃণমূলের কণ্ঠস্বর হতে চান। জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী রিজিয়া পারভিনও দলের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের আনুগত্যের কথা জানিয়ে বলেন, পদ-পদবি যাই হোক, আজীবন তিনি এই দলের আদর্শ নিয়েই থাকতে চান।
মনোনয়ন ফরমের মূল্য দুই হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ১২ এপ্রিল পর্যন্ত এই ফরম সংগ্রহ ও জমা দেওয়া যাবে। চূড়ান্ত মনোনয়নের ক্ষেত্রে পার্লামেন্টারি বোর্ড (সংসদীয় কমিটি) প্রতিটি প্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত ও দলের প্রতি দায়বদ্ধতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করবে।
সংরক্ষিত নারী আসনগুলো সাধারণত রাজপথের লড়াকু নেত্রীদের জন্য একটি বড় প্রাপ্তি। বিএনপির মতো বড় দলে যখন বিপুল সংখ্যক নারী নেত্রী ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তখন মাত্র ৩৬টি আসনে সবাইকে জায়গা দেওয়া কঠিন। তবে এবার যদি স্বজনপ্রীতি এড়িয়ে প্রকৃত নির্যাতিত ও দক্ষ বাগ্মীদের সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তা দলের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করবে এবং সংসদে কার্যকর বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের জানান দিতে পারবে।