অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভাগ্য নির্ধারণের কাজ শেষ করেছে জাতীয় সংসদ। তবে রাজনৈতিক ও আইনি মারপ্যাঁচে গণভোট, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বহুল আলোচিত পুলিশ কমিশনসহ মোট ২০টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ শেষ পর্যন্ত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। শুক্রবার রাত ১২টার পর থেকেই এসব অধ্যাদেশের কার্যকারিতা লোপ পাওয়ায় অনেক প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কার এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে গত ছয় দিনে রেকর্ড সংখ্যক ৯১টি বিল পাসের মাধ্যমে ১২০টি অধ্যাদেশের আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে। তবে ১৩টি অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদিত না হওয়ায় এবং ৭টি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিলের মাধ্যমে বাতিল করায় মোট ২০টি অধ্যাদেশ এখন অকেজো। জাতীয় সংসদের ইতিহাসে এত কম সময়ে এত বেশি বিল পাসের ঘটনা বিরল হলেও, গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কার টেকেনি সংসদের চূড়ান্ত অনুমোদনে।
অধ্যাদেশগুলো অকার্যকর হওয়ায় শাসনব্যবস্থার বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। বিশেষ করে ‘গণভোট অধ্যাদেশ’ বাতিল হওয়ায় ২০২৬ সালে পরিকল্পিত গণভোটের আইনি ভিত্তি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি পাস না হওয়ায় গুমের শিকার ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষাও এখন হুমকির মুখে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনের সংশোধনী বাতিল হওয়ায় সংস্থাটি আর আগের মতো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না; এখন থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে হলে আবারও সরকারের আগাম অনুমতি নিতে হবে।
বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বিলুপ্ত হওয়ায় উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা আবারও প্রধানমন্ত্রীর হাতে ফিরে গেছে। এর ফলে নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণও পুনরায় সরকারের হাতে ন্যস্ত হলো। মানবাধিকার কমিশনও এখন থেকে ২০০৯ সালের পুরনো আইন অনুযায়ী চলবে, যার ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতা হারাল এই সংস্থাটি।
সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির জারি করা যেকোনো অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম বৈঠকের ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদিত হতে হয়। শুক্রবারই ছিল সেই সময়সীমার শেষ দিন। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গত ১২ মার্চ ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করেছিলেন, যা পরে বিশেষ কমিটির কাছে পাঠানো হয়। কমিটি ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু পাসের সুপারিশ করলেও পুলিশ কমিশন ও গণভোটের মতো বিষয়গুলো শেষ রক্ষা পায়নি। পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশটি অকার্যকর হওয়ায় জুলাই বিপ্লবের অন্যতম বড় সংস্কার প্রস্তাবটি থমকে গেল।
তবে শেষ দিনে সংসদের কাজে গতি ছিল তুঙ্গে। সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর উত্থাপিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল’ এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খানের ‘শহীদ পরিবার ও জুলাইযোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল’ সহ মোট ২৪টি বিল পাস হয়েছে। এছাড়া সাইবার সুরক্ষা বিল এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন সংশোধনী বিলটিও পাস হয়েছে।
অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার ফলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আবারও আগের মতো একীভূত হয়ে যাচ্ছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার এনবিআরকে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যার বিরুদ্ধে কর্মচারীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। সামগ্রিকভাবে, অনেক সংস্কার টিকে গেলেও বিচার বিভাগ ও সুশাসনের সঙ্গে জড়িত বেশ কিছু বড় পরিবর্তন সংসদের অনুমোদন না পাওয়ায় জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
জাতীয় সংসদ অন্তর্বর্তী সরকারের বেশিরভাগ অধ্যাদেশকে আইনি রূপ দিলেও, গুম বা পুলিশ কমিশনের মতো সংবেদনশীল ও সংস্কারমুখী অধ্যাদেশগুলো বাতিল হওয়া হতাশাজনক। বিশেষ করে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আবারও নির্বাহী বিভাগের হাতে ফিরে যাওয়া দীর্ঘদিনের ‘বিচার বিভাগ পৃথককরণ’ আন্দোলনের পরিপন্থী। জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে যে সংস্কারের সূচনা হয়েছিল, তা যেন রাজনৈতিক কৌশলের বেড়াজালে হারিয়ে না যায়, সেদিকে সতর্ক থাকা জরুরি।