জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মহান আত্মত্যাগকে সম্মান জানিয়ে এক অনন্য নজির স্থাপন করল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। উত্তরা গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া ছয় বছর বয়সী শিশু জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগমকে সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে মনোনীত করেছে দলটি।
জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে যারা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন, সেই শহীদ পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে শহীদ জননী রোকেয়া বেগমকে সংসদের সংরক্ষিত আসনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ১৩ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়। ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এই তালিকা প্রকাশ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সংসদের আসন বিন্যাস অনুযায়ী জামায়াত জোটের ভাগে ১২টি আসন পড়ার কথা থাকলেও জোটভুক্ত শরিকদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে আসন বণ্টন করা হয়েছে। এতে জামায়াতের নিজস্ব সাতজন নেত্রীর পাশাপাশি শরিক দলগুলোর প্রতিনিধি এবং শহীদ পরিবারের সদস্য স্থান পেয়েছেন। শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম পেশায় একজন গৃহিণী। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট উত্তরার কেসি মডেল স্কুলের নার্সারির ছাত্র জাবির তার মায়ের হাত ধরে বিজয় মিছিলে গিয়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়। ছেলের সেই আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবেই আজ তার মা জাতীয় সংসদে জনগণের কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন।
জামায়াতের পক্ষ থেকে মনোনীত অন্য প্রার্থীরা হলেন— মহিলা বিভাগের সম্পাদক নূরুন্নিসা সিদ্দীকা, সহকারী সম্পাদক মারজিয়া বেগম, আইন বিষয়ক সম্পাদক সাবিকুন নাহার মুন্নি, প্রচার সম্পাদক নাজমুন নাহার নীলু, সাবেক সম্পাদক মাহফুজা সিদ্দিকা, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য সাজেদা সামাদ ও শামছুন্নাহার নাহার। এছাড়া বিশেষজ্ঞ কোটায় মনোনয়ন পেয়েছেন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ।
জোটের শরিকদের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে জামায়াত তিনটি আসন ছেড়ে দিয়েছে। ফলে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) প্রতিষ্ঠাতা শফিউল আলম প্রধানের মেয়ে তাসমিয়া প্রধান, এনসিপির ডা. মাহমুদা আলম মিতু এবং বাংলাদেশ খেলাফতের একজন প্রতিনিধি সংরক্ষিত আসনে এমপি হতে যাচ্ছেন। এনসিপির মনিরা শারমিনও জোটের তালিকাভুক্ত হয়েছেন।
মনোনয়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, "জামায়াতে কেউ পদের জন্য আবেদন করেন না। তৃণমূল ও নারী বিভাগের মতামতের ভিত্তিতেই যোগ্যদের বেছে নেওয়া হয়েছে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো সংসদে একটি শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালন করা এবং নারীদের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার থাকা।" আজ মঙ্গলবার এসব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। যেহেতু প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থী নেই, তাই মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা হলেই তাদের সবার সংসদে যাওয়া নিশ্চিত হয়ে যাবে।
রাজনৈতিক দলগুলো যখন ক্ষমতার হিসেব-নিকেশে ব্যস্ত, তখন একটি শহীদ পরিবারকে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দেওয়া নিসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও মানবিক পদক্ষেপ। এটি কেবল একটি দলের রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং গণঅভ্যুত্থানের আবেগের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন। শহীদ জননীদের সংসদে উপস্থিতি আগামী দিনে গণআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে কতটা সহায়ক হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।