আর খুব বেশি দিন বাকি নেই ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের। ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বিশাল ক্রীড়াযজ্ঞের মূল আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের যোগ্য সঙ্গী হিসেবে থাকছে কানাডা ও মেক্সিকো। মাঠের লড়াই শুরু হতে দেরি থাকলেও, এরই মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ দলগুলো নিজেদের দলীয় ঘাঁটি, থাকার জায়গা ও অনুশীলনের মাঠ চূড়ান্ত করে ফেলেছে।
আসন্ন এই বিশ্ব আসরের ১০৪টি খেলার সিংহভাগই অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে। যাতায়াতের ক্লান্তি এড়াতে ও নিজেদের সেরাটা ঢেলে দিতে প্রতিটি দলই তাদের খেলার মাঠের কাছাকাছি নিজেদের মূল ঘাঁটি বা আবাসন চূড়ান্ত করেছে। বিলাসবহুল থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশ্বমানের অনুশীলনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেছে প্রতিটি দেশ।
বর্তমান শিরোপাজয়ী দল আর্জেন্টিনা তাদের মূল ঘাঁটি তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটিতে। সেখানে তারা আধুনিক সব সুবিধা সম্বলিত একটি উন্নত ক্রীড়াকেন্দ্রে অনুশীলন করবে। গত আসরের মতো এবারের আসরেও খেলোয়াড়দের মানসিক প্রশান্তির জন্য ঐতিহ্যবাহী খাবার ও আরামদায়ক নিজস্ব পরিবেশের ব্যবস্থা রাখছে লাতিন আমেরিকার এই পরাশক্তি। অন্যদিকে, পাঁচবারের শিরোপাজয়ী ব্রাজিল বেছে নিয়েছে নিউ ইয়র্ক শহরকে। তারা পার্শ্ববর্তী নিউ জার্সির একটি অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিজেদের প্রস্তুত করবে। লাতিন আমেরিকার আরেক শক্তিশালী দল উরুগুয়ে মেক্সিকোর একটি সমুদ্রতীরবর্তী অবকাশযাপন কেন্দ্রে থাকবে, যেখান থেকে তাদের নির্ধারিত খেলার শহরগুলোতে যাতায়াত করা সহজ হবে।
পিছিয়ে নেই ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোও। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দল স্পেন টেনেসির একটি অভিজাত ব্যক্তিগত বিদ্যালয়ে অবস্থান করবে। খেলোয়াড়দের গোপনীয়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সেখানে বিশেষ বেষ্টনী তৈরি করা হচ্ছে। সাবেক শিরোপাজয়ী ফ্রান্স বোস্টনের বিলাসবহুল আবাসনে থেকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে নিজেদের ঝালিয়ে নেবে। চারবারের বিশ্বজয়ী জার্মানি তাদের গোপনীয়তা রক্ষায় নর্থ ক্যারোলিনার একটি বিশেষায়িত অবকাশযাপন কেন্দ্র বেছে নিয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশের কোনো সুযোগ থাকবে না। এছাড়া ইংল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস কানসাস সিটিকে তাদের মূল ঘাঁটি হিসেবে নির্বাচন করেছে। ডাচরা তাদের ঐতিহ্যবাহী 'কমলা দ্বিতল বাস' এই আসরেও নিয়ে আসবে বলে জানা গেছে, যা দর্শকদের জন্য এক বাড়তি উন্মাদনার খোরাক জোগাবে। এদিকে, পর্তুগাল ফ্লোরিডার পাম বিচে অবস্থান করবে, যেখানে বিশাল আয়তনের একাধিক খেলার মাঠ রয়েছে।
এশিয়া, আফ্রিকা ও ওশেনিয়া অঞ্চলের দলগুলোও নিজেদের সুবিধানুযায়ী ঘাঁটি চূড়ান্ত করেছে। সৌদি আরব টেক্সাসের অস্টিনে, জাপান টেনেসিতে এবং দক্ষিণ কোরিয়া মেক্সিকোর একটি শহরে অবস্থান করবে। বিশেষ করে পাহাড়ি উচ্চতার ওপরে খেলার সাথে মানিয়ে নেওয়ার কৌশল হিসেবে অনেক দল মেক্সিকোকে বেছে নিয়েছে। আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল মরক্কো ও সেনেগাল নিউ জার্সিতে নিজেদের আস্তানা গেড়েছে, কারণ ওই অঞ্চলে তাদের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী সমর্থক বসবাস করেন। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ক্যালিফোর্নিয়ার শান্ত পরিবেশে নিজেদের ঘাঁটি স্থাপন করেছে।
আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা নিজেদের দেশের পরিচিত পরিবেশকেই কাজে লাগানোর সর্বোচ্চ সুযোগ পাচ্ছে। মেক্সিকো তাদের রাজধানীকেই মূল ঘাঁটি বানিয়েছে, যা তাদের খেলোয়াড়দের নিজ দেশের আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নিতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করবে।
তবে এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক সিদ্ধান্ত নিয়েছে এশীয় দল ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিরাজমান রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও নিরাপত্তার উদ্বেগের কারণে, বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিশেষ অনুমোদন নিয়ে তারা নিজেদের ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের বদলে মেক্সিকোর সীমান্ত শহর তিজুয়ানায় স্থানান্তর করেছে। এছাড়া দীর্ঘ ৪০ বছর পর বিশ্বমঞ্চে ফেরা ইরাক যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার এমন একটি বিলাসবহুল জায়গায় থাকছে, যেখানে এর আগে ২৮ জন মার্কিন রাষ্ট্রপতি অবকাশ যাপন করেছেন।
৪৮টি দলের অংশগ্রহণে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের পরিধি যেমন কয়েক গুণ বাড়িয়েছে, তেমনি আয়োজক ও অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর জন্য ব্যবস্থাপনাগত এক বিশাল চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। তবে দলগুলোর আগেভাগেই নিজেদের ঘাঁটি চূড়ান্ত করার এই প্রতিযোগিতা প্রমাণ করে, মাঠের বাঁশিতে ফুঁ পড়ার অনেক আগেই আসলে স্নায়ুর লড়াই শুরু হয়ে যায়। একটি দলের সাফল্য কেবল মাঠের ৯০ মিনিটের ওপর নির্ভর করে না; বরং তাদের পেছনের দীর্ঘ প্রস্তুতি, মানসিক প্রশান্তি এবং নিভৃত অনুশীলনই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে কারা বিশ্বজয়ের মুকুট পরবে।