সরকার ও রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কাঠামোকে পৃথক রাখার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের স্বার্থে তিনি নিজ হাতে গড়া রাজনৈতিক দল গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারীর পদ থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন।
সরকার ও দলের মধ্যকার প্রাতিষ্ঠানিক স্বকীয়তা বজায় রাখার লক্ষ্য নিয়ে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারীর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বর্তমান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। শনিবার (৪ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর হাতিরপুলে অবস্থিত দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা প্রদান করেন। জোনায়েদ সাকির পদত্যাগের পর দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন দেওয়ান আবদুর রশিদ নিলু।
সংবাদ সম্মেলনে জোনায়েদ সাকি তার এই সিদ্ধান্তের পেছনে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য রাষ্ট্রীয় সরকার এবং রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বকে আলাদা রাখা জরুরি। আমি মনে করি, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে দলের প্রধান পদে থাকা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার অন্তরায় হতে পারে। তাই সরকার ও দলকে পৃথক রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকেই আমি এই পথ বেছে নিয়েছি।”
স্মর্তব্য যে, গত বছরের ৩ নভেম্বর সাভারে অনুষ্ঠিত গণসংহতি আন্দোলনের পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে জোনায়েদ সাকি পুনরায় প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই সম্মেলনে ৫৫ সদস্যের একটি শক্তিশালী নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার এই অবস্থান বদল দেশের রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক জীবনের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা জোনায়েদ সাকি চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর জোটের শরিক হিসেবে তাদের দলীয় প্রতীক ‘মাথাল’ (কৃষকের ঐতিহ্যবাহী টোকা) নিয়ে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচনের পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারে তাকে প্রথমে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে তাকে শুধুমাত্র পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ন্যস্ত করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সমসাময়িক রাজনৈতিক ইস্যু এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়েও কথা বলেন এই নেতা। তিনি জানান, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে বর্তমানে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক থাকলেও এটি একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। তিনি মনে করেন, এই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের মতামতই চূড়ান্তভাবে প্রাধান্য পাবে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, নতুন ভারপ্রাপ্ত প্রধান সমন্বয়কারীর নেতৃত্বে গণসংহতি আন্দোলন রাজপথে তাদের আদর্শিক সংগ্রাম আরও বেগবান করবে। একই সাথে তিনি দেশের টেকসই উন্নয়ন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারি কাজে নিজের পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
জোনায়েদ সাকির এই পদত্যাগ বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বিরল ও ইতিবাচক বার্তা প্রদান করে। সাধারণত ক্ষমতা ও দলীয় পদ আঁকড়ে ধরার প্রবণতা যেখানে প্রবল, সেখানে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার এই মানসিকতা গণতান্ত্রিক চর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। তবে দলটির আগামী দিনের সাংগঠনিক ভিত্তি ধরে রাখা এবং সরকারের ভেতর থেকে নিজ আদর্শের প্রতিফলন ঘটানো সাকির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখা দিচ্ছে।