সংবিধানে সংস্কার আনার লক্ষ্যে গণভোটের (জনগণের সরাসরি মত যাচাইয়ের প্রক্রিয়া) মাধ্যমে প্রাপ্ত রায় বাস্তবায়নের দাবিতে নতুন আন্দোলনের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। আগামী ১০ এপ্রিল সারাদেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিক্ষোভ এবং ২৪ এপ্রিল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল গণসমাবেশের মধ্য দিয়ে দলটি তাদের শক্তি প্রদর্শন করতে যাচ্ছে।
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এই প্রেক্ষাপটে শনিবার রাজধানীর পুরানা পল্টনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দলের আমির মাওলানা মামুনুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে দলের পক্ষ থেকে দুই দিনের এই কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
দলের নেতারা জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের (জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির দেওয়া বিশেষ আইন) মধ্যে বেশ কয়েকটি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সংসদীয় বিশেষ কমিটি ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই সংসদে না তোলার সুপারিশ করেছে, যার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘গণভোট অধ্যাদেশ’টিও রয়েছে। খেলাফত মজলিসের আশঙ্কা, এর ফলে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন তথা সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং এই অধ্যাদেশগুলো এক সময় কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলতে পারে। জনগণের রায়কে উপেক্ষা করার এই প্রচেষ্টাকে রুখে দিতেই তারা রাজপথে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বৈঠকে মাওলানা মামুনুল হক বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকার যে সংবিধানের দোহাই দিয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিল, সেই একই সংবিধানের প্রতি এখন দেশের একটি বড় দলের মায়া জন্মেছে। জনগণের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট রায়ের পরও বিএনপি সংবিধানের আমূল সংস্কারের পরিবর্তে কেবল কিছু সংশোধনী এনে বিষয়টিকে পাশ কাটাতে চাইছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই পুরোনো কাঠামোর পরিবর্তন না হলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ স্বৈরাচারী শক্তির উত্থান ঘটার পথ প্রশস্ত হবে।
এর আগে গত বুধবার সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার দাবিতে আনীত একটি প্রস্তাব সংসদে প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সংসদ থেকে ওয়াক আউট (প্রতিবাদ জানিয়ে অধিবেশন ত্যাগ করা) করে। খেলাফত মজলিস সেই জোটের অন্যতম শরিক হিসেবে তাদের দাবি আদায়ে রাজপথে আরও সক্রিয় হওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
বৈঠকে কেবল রাজনৈতিক বিষয়ই নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে দেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট এবং শিশুদের জীবন রক্ষাকারী প্রয়োজনীয় টিকার অভাব নিয়ে নেতারা গভীর উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন। তারা অবিলম্বে এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন।
আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গে খেলাফত মজলিস নেতারা ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত হামলার কড়া সমালোচনা করেন। তারা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ করা এবং বিশ্ব নেতাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। ফিলিস্তিন ও ইরানসহ মুসলিম বিশ্বের ওপর যেকোনো ধরণের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা।
দলের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমেদের সঞ্চালনায় এই বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র নায়েবে আমির ইউসুফ আশরাফ, রেজাউল করীম, সাঈদ নূর, কোরবান আলী কাসেমী এবং যুগ্ম-মহাসচিব আতাউল্লাহ আমীনসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। তারা সকলেই তৃণমূল পর্যায়ে ১০ এপ্রিলের বিক্ষোভ কর্মসূচি সফল করার জন্য নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক কোনো বিষয় নয়, বরং এটি একটি রাষ্ট্র সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার অংশ। খেলাফত মজলিস যে গণভোটের রায় কার্যকরের দাবি জানাচ্ছে, তা যদি বাস্তবায়িত না হয় তবে নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাব এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। সাধারণ মানুষের চাওয়া কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যেখানে জনমতের প্রতিফলন ঘটবে। রাজপথের এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সংসদীয় সিদ্ধান্তের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।