দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে এবং খেলোয়াড়দের পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো বেতন কাঠামো ও বিশেষ পরিচয়পত্র (ক্রীড়া কার্ড) ব্যবস্থা চালু করেছে সরকার। সোমবার এই ঐতিহাসিক কার্যক্রমের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খেলোয়াড়দের রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে দেশের মর্যাদা রক্ষায় আত্মনিয়োগ করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খেলোয়াড়দের প্রতি বিশেষ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে আপনারা কোনো রাজনৈতিক দল বা বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর অংশ নন। আপনাদের মূল পরিচয় হলো আপনারা দেশের প্রতিনিধি।
আপনাদের ক্রীড়া নৈপুণ্য দিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার সম্মান সমুন্নত রাখাই হোক একমাত্র লক্ষ্য।"
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেবল শখ বা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বর্তমান বিশ্বে খেলাধুলা একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশকেও এই ধারায় এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বর্তমান সরকার। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে দেওয়া নির্বাচনী ইশতেহারে (রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার দলিল) ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার যে অঙ্গীকার বিএনপি করেছিল, আজকের এই আয়োজনের মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুরু হলো।
খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস জোগাতে প্রধানমন্ত্রী বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইন্সটাইনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, "যে মানুষটি কখনো পরাজিত হয়নি, সে আসলে নতুন কিছু করার চেষ্টাই করেনি।" খেলাধুলায় হার-জিত থাকবেই, তবে পরাজয়কে দমে যাওয়ার কারণ না ভেবে পরবর্তী জয়ের সিঁড়ি হিসেবে গ্রহণ করার পরামর্শ দেন তিনি।
সরকার খেলোয়াড়দের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে তাদের নিয়মিত বেতন কাঠামোর আওতায় আনা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, "যিনি যে খেলায় পারদর্শী, তিনি যেন সেই খেলাটিকেই কোনো আর্থিক দুশ্চিন্তা ছাড়াই পেশা হিসেবে নিতে পারেন, সেটিই আমাদের লক্ষ্য। একজন খেলোয়াড় বা তার পরিবার যেন অভাব-অনটনের কারণে খেলাধুলা ছেড়ে দিতে বাধ্য না হন, সেজন্যই এই বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা।"
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, সরকার কেবল ক্রীড়াঙ্গন নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে। পর্যায়ক্রমে পরিবার কার্ড (ফ্যামিলি কার্ড), ধর্মীয় গুরুদের জন্য সম্মানী ভাতা এবং দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির সুফল জনগণ পেতে শুরু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ থেকে দেশে প্রথমবারের মতো 'কৃষক কার্ড' বা কৃষকদের জন্য বিশেষ পরিচয়পত্র প্রদানের কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (শারীরিক প্রতিবন্ধী) ক্রীড়াবিদদের জন্য সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "সবার জন্য ক্রীড়া—এই মূলমন্ত্র নিয়ে আমরা এগোচ্ছি। যারা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে দেশের জন্য সুনাম আনছেন, তারাও এই বিশেষ ক্রীড়া পরিচয়পত্র ও ভাতার আওতায় থাকবেন।"
ক্রিকেট ও ফুটবলের পাশাপাশি তীরন্দাজি (আর্চারি), বক্সিং, যোগব্যায়াম, কসরত (জিমন্যাস্টিকস), ভারোত্তোলন, সাঁতার, দৌড়ঝাঁপ (অ্যাথলেটিক্স) ও ব্যাডমিন্টনের মতো বিভিন্ন খেলার প্রসারে সরকার ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সম্প্রতি দক্ষিণ এশীয় ফুটসালে (গৃহমধ্যস্থ ফুটবল) বাংলাদেশের নারী দলের শিরোপা জয়ের উদাহরণ টেনে তিনি সব ধরনের খেলায় সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানোর তাগিদ দেন।
শিক্ষা ব্যবস্থায় খেলাধুলাকে আরও গুরুত্ব দিতে চতুর্থ শ্রেণি থেকেই ক্রীড়াকে বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী প্রত্যাশা করেন, শিশুরা যেন পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই সুস্থ ও সবল হয়ে বেড়ে ওঠে। এজন্য শিক্ষাক্রম (শিক্ষা সিলেবাস) পরিমার্জনের কাজ শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এছাড়া দেশের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকা মেধা অন্বেষণে আগামী ৩০ এপ্রিল সিলেট থেকে শুরু হচ্ছে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ নামক দেশব্যাপী ক্রীড়া প্রতিভা খোঁজার এক মহোৎসব।
অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী একটি বহনযোগ্য কম্পিউটারের (ল্যাপটপ) বোতাম চেপে সরাসরি আন্তঃজাল ভিত্তিক (অনলাইন) লেনদেন ব্যবস্থার মাধ্যমে ১২৯ জন ক্রীড়াবিদের প্রত্যেকের মুঠোফোনে এক লক্ষ টাকা করে ভাতা পৌঁছে দেন। সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে এই অর্থ বিতরণ করা হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জনকারী বেশ কয়েকজন ক্রীড়াবিদকে এদিন বিশেষ সম্মাননাও প্রদান করা হয়।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান এবং অন্যান্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী হল চত্বরে খেলোয়াড়দের সাথে একটি বিশেষ আলোকচিত্রে অংশ নেন।
বাংলাদেশে ক্রীড়াঙ্গনকে পেশাদারিত্বের আওতায় আনার এই উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী। এতদিন আমাদের দেশের খেলোয়াড়দের আর্থিক নিরাপত্তা ছিল অনিশ্চিত, যা অনেক মেধাবী খেলোয়াড়কে অঙ্কুরেই ঝরিয়ে দিত। প্রধানমন্ত্রীর এই বেতন ও ভাতা প্রদানের ঘোষণা ক্রীড়াবিদদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খেলাধুলাকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রাখার আহ্বান। ক্রীড়াঙ্গন যদি রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত থাকতে পারে এবং মেধার ভিত্তিতে মূল্যায়িত হয়, তবেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সাফল্য নিয়মিত রূপ পাবে। শৈশব থেকেই ক্রীড়াকে শিক্ষার অংশ করার সিদ্ধান্তটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।