আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপের জন্য ব্রাজিলের সম্ভাব্য দল প্রায় গুছিয়ে ফেলেছেন ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। তবে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে শোনা যাচ্ছে, নেইমার জুনিয়রকে ছাড়াই বিশ্বজয়ের অভিযানে নামতে পারে সেলেসাওরা।
ব্রাজিল ফুটবলের গত এক দশকের ধ্রুবতারা নেইমার জুনিয়রকে ঘিরে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। মার্চ মাসের আন্তর্জাতিক বিরতিতে দলে জায়গা না পাওয়া এই তারকা ফরোয়ার্ডের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে এখন জোরালো সংশয় দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোচ কার্লো আনচেলত্তি তার ২৬ সদস্যের প্রাথমিক তালিকায় নেইমারকে রাখার প্রয়োজন বোধ করছেন না।
আনচেলত্তির এই পরিকল্পনার মূলে রয়েছে দলের ভারসাম্য এবং ফিটনেস। ২০২৩ সালের অক্টোবরে উরুগুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে হাঁটুতে গুরুতর চোট (অ্যান্টিরিয়র ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট ইনজুরি) পাওয়ার পর থেকে জাতীয় দলের জার্সিতে আর দেখা যায়নি নেইমারকে। দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে ক্লাব ফুটবলে সান্তোসের হয়ে ফিরলেও চলতি বছর মাত্র পাঁচটি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) এবং কোচ আগে থেকেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন, দলে জায়গা পেতে হলে যেকোনো খেলোয়াড়কে শতভাগ শারীরিক সক্ষমতা (ফিটনেস) প্রমাণ করতে হবে। আর এই কঠিন মানদণ্ডেই আপাতত পিছিয়ে পড়েছেন ৩৪ বছর বয়সী এই তারকা।
কোচ আনচেলত্তির দর্শন স্পষ্ট—তিনি একক কোনো মহাতারকার ওপর নির্ভর না করে একটি শক্তিশালী দলগত সংহতি গড়ে তুলতে চান। তার সম্ভাব্য ২৬ জনের তালিকায় ইতোমধ্যে ২৪ জনের নাম চূড়ান্ত হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। বাকি দুটি জায়গার জন্য লড়াই চলছে তরুণ তুর্কি লুকাস পাকেতা, এন্দরিক এবং ইগোর থিয়াগোর মধ্যে। এই তালিকায় নেইমারের নাম না থাকা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ব্রাজিল ফুটবল এখন এক নতুন যুগের সন্ধানে, যেখানে তারুণ্য আর কৌশলের মিশেলে বিশ্বমঞ্চে দাপট দেখাতে চায় তারা।
তবে নেইমারকে বাদ দেওয়ার এই গুঞ্জন ফুটবল বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার রোনালদো নাজারিও, রোমারিও এবং কাফুর মতো তারকারা নেইমারের অভিজ্ঞতার গুরুত্ব তুলে ধরে তার পক্ষে কথা বলেছেন। এমনকি বর্তমান দলের প্রাণভোমরা ভিনিসিউস জুনিয়র এবং রদ্রিগো গোয়েসও তাদের প্রিয় ‘নাম্বার টেন’-কে দলের সঙ্গে দেখতে চেয়েছেন। তাদের মতে, মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি ড্রেসিংরুমে নেইমারের উপস্থিতি তরুণদের জন্য বিশাল অনুপ্রেরণা হতে পারে।
নেইমার দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলের আক্রমণের প্রধান সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার সৃজনশীল ফুটবল আর জাদুকরী ড্রিবলিং সমর্থকদের মুগ্ধ করেছে বছরের পর বছর। কিন্তু আধুনিক ফুটবলের গতি আর তীব্রতার সঙ্গে তাল মেলাতে আনচেলত্তি হয়তো আবেগ বর্জন করে কঠিন বাস্তবতার পথেই হাঁটছেন। যদি শেষ পর্যন্ত নেইমার স্কোয়াডে জায়গা না পান, তবে সেটি হবে ব্রাজিল ফুটবলে একটি দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের বিষাদময় সমাপ্তি।
ফুটবল কি শুধুই পরিসংখ্যান আর শারীরিক সক্ষমতার খেলা, নাকি এখানে অভিজ্ঞতার মূল্য অপরিসীম? নেইমারের মতো একজন প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে ছাড়াই বিশ্বকাপে যাওয়ার সিদ্ধান্ত যেমন সাহসিকতার পরিচয় দেয়, তেমনি তা বড় ধরনের ঝুঁকিরও কারণ হতে পারে। শেষ মুহূর্তে আনচেলত্তি কি তার সিদ্ধান্তে অটল থাকবেন, নাকি নেইমার ফিরবেন রাজার বেশে—সেই উত্তর পেতে ফুটবল বিশ্বকে আরও কিছুদিন অপেক্ষায় থাকতে হবে।