গণভোটের গুরুত্বকে সংবিধানের চেয়েও শক্তিশালী হিসেবে বর্ণনা করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতই চূড়ান্ত। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে প্রয়োজনে জুলাই বিপ্লবের মতো আবারও রাজপথে নামার প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রাজধানীর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে আয়োজিত দলের এক গুরুত্বপূর্ণ কর্মী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ আলোকপাত করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, গণভোটের মাধ্যমে উঠে আসা জনগণের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা কারও নেই। তার মতে, গণভোট কোনো সাধারণ প্রক্রিয়া নয়, এটি সংবিধানের চেয়েও উচ্চতর মর্যাদা (সুপ্রিম পজিশন) ভোগ করে।
ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি অতীতে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। সংবিধানের দোহাই দিয়ে গণভোটের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার যে চেষ্টা চলছে, তার কঠোর প্রতিবাদ জানান তিনি। প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, অতীতে যখন দেশে প্রথম গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল, তখন কি সংবিধানে এর স্পষ্ট বিধান ছিল? প্রকৃতপক্ষে জনগণের আকুল আকাঙ্ক্ষাই হলো আইন ও সংবিধানের মূল উৎস।
নির্বাচনপূর্ব পরিস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে জামায়াত আমির অভিযোগ করেন, অনেক দলই ভোটের আগে গণভোটের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়লাভ করার পর তাদের অবস্থান বদলে গেছে। তিনি একে রাজনৈতিক ভণ্ডামি হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, যারা প্রকৃত গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তাদের উচিত গণভোটের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। ভেতরে এক কথা আর বাইরে অন্য কথা বলার রাজনীতি দেশের মানুষ আর গ্রহণ করবে না।
সমাবেশে তিনি রসিকতা ও শ্লেষ মিশিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির একটি দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমে ও জনমুখে এখন 'জান্নাতের টিকিট' বিক্রির কথা ভেসে বেড়াচ্ছে। সংসদে তিনি সরকারের কাছে জানতে চাইবেন এই বিশেষ টিকিটের রহস্য কী এবং এটি দেখতে কেমন। মূলত শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন অসংগতি এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণাকে কটাক্ষ করতেই তিনি এই মন্তব্য করেন।
বিরোধীদলীয় নেতা আরও হুঁশিয়ারি দেন যে, জনগণের রায়কে অস্বীকার করাই হলো নতুন করে স্বৈরতন্ত্র বা ফ্যাসিবাদের (নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অপব্যবহার) সূচনা। তিনি মনে করেন, জুলাই মাসের আন্দোলনে ছাত্র-জনতা যেভাবে রাজপথে নেমে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিল, অধিকার আদায়ে আবারও ঠিক সেভাবেই ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।
আগামীকাল থেকে ঢাকায় ১১ দলীয় জোটের ঘোষিত কর্মসূচি শুরু হতে যাচ্ছে। ডা. শফিকুর রহমান দলের নেতাকর্মীদের এই আন্দোলন সফল করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত জনগণের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে, ততক্ষণ এই সংগ্রাম চলবে। রাজপথে লড়াইয়ের মাধ্যমেই জনদাবি আদায় করে ছাড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
গণভোটের দাবি নিয়ে জামায়াত আমিরের এই অনড় অবস্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন বিতর্ক উসকে দিচ্ছে। সংবিধান বনাম জনগণের সরাসরি মতামত—এই দ্বন্দ্বে দেশ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে, তা এখন বড় প্রশ্ন। রাজপথে আবারও বড় ধরনের আন্দোলনের যে ঘোষণা দেওয়া হলো, তা রাজনৈতিক অস্থিরতা নাকি সংস্কারের নতুন পথ তৈরি করবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতার অভাব সাধারণ মানুষকে আবারও উৎকণ্ঠায় ফেলছে।