আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চলমান পুরোনো ঋণ কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসছে বাংলাদেশ। দেশের মানুষের কল্যাণ ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংস্থাটির সঙ্গে নতুন একটি কর্মসূচি শুরু করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আজ রবিবার (১২ জুলাই) দুপুরে সচিবালয়ে অর্থ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আইএমএফের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী। ইভো ক্রজনারের (আইএমএফের মুদ্রা ও পুঁজিবাজার বিভাগের ডেপুটি ডিভিশন প্রধান) নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি দল এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেয়। বৈঠকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব নীতি এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে নেওয়া ঋণ কর্মসূচিতে সাধারণ জনগণের স্বার্থ সঠিকভাবে রক্ষা করা হয়নি। ফলে সেই পুরোনো কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে বর্তমান সরকার নতুনভাবে ঋণ কর্মসূচি সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, দেশে ডলার সংকট মোকাবিলা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (সঞ্চিত তহবিল) শক্তিশালী করা এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ২০২৩ সালে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি ঋণ চুক্তি করেছিল বাংলাদেশ। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এই ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়েছিল। এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে কিছুটা স্থিতিশীল করা।
চুক্তির পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ পাঁচ কিস্তিতে মোট ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। তবে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড়ের বিষয়ে প্রায় এক বছর ধরে আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত তা চূড়ান্ত রূপ পায়নি। বিভিন্ন সংস্কারমূলক শর্তের বাস্তবায়ন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দ্বিমত থাকায় এই বিলম্ব ঘটে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। এমন পরিস্থিতিতে দুই পক্ষই এখন অতীতের জটিলতা পরিহার করে সম্পূর্ণ নতুন একটি ঋণ কর্মসূচির দিকে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড়ের বিষয়ে সরকারের কোনো উদ্বেগ নেই উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, "পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া ঋণ কর্মসূচির তুলনায় নতুন এই উদ্যোগ দেশের স্বার্থকে অনেক বেশি সুরক্ষিত করবে। আমরা কিস্তির অর্থ পাওয়ার চেয়ে দেশের মানুষের সার্বিক কল্যাণকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছি।"
এর পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের বাংলাদেশে আসার প্রক্রিয়া সহজ করতে ভিসা নীতিতেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও সংস্কার আনা হবে বলে অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করতে এবং পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা অত্যন্ত জরুরি।
ঢাকা সফর শেষে আইএমএফের প্রতিনিধি দলটি ওয়াশিংটনে তাদের সদর দপ্তরে একটি সামগ্রিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেবে। সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রতিবেদনটি ইতিবাচক হলে আগামী অক্টোবর মাসে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার পর নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হতে পারে। সে সময় আইএমএফের আরেকটি বিশেষ কারিগরি প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে, যারা নতুন ঋণের রূপরেখা ও সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি চূড়ান্ত করতে কাজ করবে।