দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনতে এবং বেসরকারি খাতের বিকাশ নিশ্চিত করতে স্থানীয় ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে সরকার। উচ্চ সুদে ব্যাংক থেকে সরকারের মাত্রাতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি বিনিয়োগে যে স্থবিরতা তৈরি হয়, তা থেকে বেরিয়ে আসতে বিকল্প অর্থায়নের পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ২০২৫-২৬ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
রোববার (২১ জুন) রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত লেকশোর হোটেলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘বাজেট পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক বিশেষ সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা জানান। অনুষ্ঠানটিতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
বিনিয়োগ ও ঋণকাঠামো সংস্কারের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত এক দশক ধরেই আমি বলে আসছি, স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকার যদি ১০ থেকে ১৩ শতাংশ উচ্চ সুদে ব্যাংক থেকে টাকা ধার নেয়, তবে বেসরকারি খাতের জন্য টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এত চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সরকার কীভাবে তা পরিশোধ করবে, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই আমরা ধীরে ধীরে ব্যাংক নির্ভরতা কমিয়ে বাজারভিত্তিক ও বিকল্প অর্থায়নের দিকে নিবিড় মনোযোগ দিচ্ছি।
চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের পেছনের নানাবিধ চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, একটি পূর্ণাঙ্গ বাজেট প্রণয়নে সাধারণত ছয় মাসের মতো দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে মাত্র দেড় মাসের প্রস্তুতির মাধ্যমে এই বাজেট তৈরি করতে হয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল অঙ্কের বকেয়া বিলের দায়ভারও বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বিদ্যুৎ খাতের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বকেয়া বিলের কথা উল্লেখ করেন।
সরকারের খরচের খাত সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে অর্থমন্ত্রী জানান, প্রস্তাবিত এই বাজেটের প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে কেবল ঋণের সুদ বা ঋণ পরিশোধ (ডেট সার্ভিসিং) খাতে। এর ফলে সরকারের অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজের জন্য আর্থিক পরিসর (ফিসকাল স্পেস) উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসছে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা আনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন মন্ত্রী। তিনি জানান, সুবিধাভোগীদের কাছে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে, যাতে মাঝপথে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী সুবিধা নিতে না পারে। বিশেষ করে পরিবার পরিচিতি পত্র বা ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি গৃহিণীদের কিংবা পরিবারের যোগ্য সদস্যদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে নারীদের গৃহস্থালি কাজের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি মিলছে, যা সমাজে সহনশীলতা বাড়াতে দারুণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক কৃষকদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও সরকার সরাসরি সেবা প্রদান কার্যক্রম জোরদার করছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের রূপরেখা নিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জিডিপির ২ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে এটি ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। দেশের জনমিতিক লভ্যাংশ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) কাজে লাগাতে হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন (স্কিল ডেভেলপমেন্ট), পুনরায় দক্ষতা অর্জন (রিস্কিলিং) এবং উচ্চতর দক্ষতা বৃদ্ধির (আপস্কিলিং) ওপর সর্বাধিক জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমিয়ে আনতে সরকার শুরুতেই প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার (প্রিভেন্টিভ হেলথ কেয়ার) ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করছে।
সিপিডির এই গুরুত্বপূর্ণ সংলাপে বাজেটের নানাদিক নিয়ে আরও আলোচনা করেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ, তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান এবং গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ।