দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রকল্পের উপযোগিতা বিবেচনা করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া বেশ কিছু বড় প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। বিশেষ করে যেসব প্রকল্পে ব্যয় অনেক বেশি কিন্তু জনস্বার্থ বা প্রয়োজনীয়তা তুলনামূলক কম, সেগুলোকেই ছাঁটাইয়ের তালিকায় রাখা হচ্ছে।
দেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বিগত ১৮ মাসের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় নামে পরিকল্পনা কমিশন। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) ১৯টি বৈঠকে মোট ১৩৫টি নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে অনেকগুলো প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে। সাধারণত ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোকে 'বড় প্রকল্প' হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এ ধরনের ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর উপযোগিতা নিয়ে নতুন করে কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কিছু প্রকল্প আপাতত স্থগিত রাখা এবং কিছু প্রকল্পের গতি কমিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কমিশনের একজন পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিতর্কিত প্রকল্প না থাকলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকগুলো প্রকল্পের অর্থায়ন এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে যেসব প্রকল্পে বিদেশি ঋণ নেই এবং সম্পূর্ণ সরকারি তহবিলের ওপর নির্ভরশীল, সেগুলোই এখন পর্যালোচনার প্রধান বিষয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে অনুমোদিত অন্যতম বড় প্রকল্প ছিল ইস্টার্ন রিফাইনারির (ইআরএল) আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ। ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকার এই বিশাল প্রকল্পে কোনো বিদেশি সাহায্য পাওয়া যায়নি। এর পুরো ব্যয়ই সরকারি কোষাগার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার বহন করার কথা ছিল। এছাড়া ৩১১ কোটি টাকা ব্যয়ে বাপেক্সের গ্যাস কূপ অনুসন্ধান এবং ১ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেল সংরক্ষণ প্রকল্পের মতো বড় বাজেটের কাজগুলো এখন নতুন করে মূল্যায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
অন্যদিকে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্পের ব্যয় শেষ মুহূর্তে প্রায় ২৫ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছিল, যা নিয়ে বর্তমানে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। তবে কিছু ইতিবাচক উদাহরণও রয়েছে; যেমন মেট্রোরেলসহ সাতটি প্রকল্পে ব্যয় কমানোর মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা সাশ্রয় করা হয়েছে, যা দেশের উন্নয়ন ইতিহাসে সচরাচর দেখা যায় না।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, "সরকারের বর্তমান আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে যেসব প্রকল্পের কাজ এখনও শুরু হয়নি, সেগুলো আপাতত স্থগিত রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তবে যেসব প্রকল্পের কাজ শেষের পথে, সেগুলো দ্রুত শেষ করা উচিত যাতে বিনিয়োগ বৃথা না যায়।"
সমাপনী বিশ্লেষণ
উন্নয়ন প্রকল্পের নামে জনশক্তির অপচয় এবং ঋণের বোঝা বাড়ানো কোনো টেকসই সমাধান নয়। অন্তর্বর্তী সরকার অনেক প্রকল্প আবেগ বা তৎকালীন পরিস্থিতির চাপে গ্রহণ করলেও, বর্তমান সরকারকে বাস্তবতার জমিনে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বড় অংকের বাজেট মানেই বড় উন্নয়ন নয়—বরং সীমিত সম্পদের সঠিক ব্যবহারই এখন সময়ের দাবি। তবে প্রকল্প বাতিলে যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ছায়া না পড়ে, সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।