ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের পদত্যাগের দাবিতে টানা নবম দিনের মতো রাজপথে নেমেছেন বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। তবে এবারের আন্দোলনে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে বিপুলসংখ্যক নারী গ্রাহকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। আমানতের নিরাপত্তার দাবিতে রাজধানীর বুকে চলা এই অবস্থান কর্মসূচি দেশের আর্থিক খাতের আস্থার সংকটকেই যেন নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই রাজধানীর মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার চিত্র ছিল অন্যান্য দিনের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ভবনের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন সাধারণ গ্রাহকরা। 'সচেতন গ্রাহক ফোরাম'-এর ব্যানারে আয়োজিত এই অবস্থান কর্মসূচি দেখতে দেখতে এক বিশাল জনসমাবেশে পরিণত হয়। টানা আট দিন ধরে চলা মানববন্ধন কর্মসূচির পর নবম দিনে এসে আরও তীব্র আকার ধারণ করে এই আন্দোলন।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বিপুলসংখ্যক নারী গ্রাহকের স্বতঃস্ফূর্ত ও সরব অংশগ্রহণ। সকাল দশটা থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে শতাধিক নারী তাদের সঞ্চিত অর্থের নিরাপত্তার দাবিতে রাজপথে নেমে আসেন। আগের দিনগুলোতে মূলত পুরুষ আমানতকারীদের উপস্থিতি বেশি লক্ষ্য করা গেলেও, মঙ্গলবার নারীদের এই উপস্থিতি আন্দোলনের মাত্রাকে এক নতুন রূপ দিয়েছে। রোদের তীব্রতা উপেক্ষা করে তারা ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বের পরিবর্তনের দাবিতে টানা স্লোগান দিতে থাকেন।
অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা গণমাধ্যমের কাছে তাদের গভীর উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। তাদের মূল ক্ষোভ ব্যাংকটির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমকে ঘিরে। আন্দোলনকারীদের দাবি, যার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তাকে দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক (ইসলামি আইন অনুযায়ী পরিচালিত) ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসানো কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। নিজেদের ঘামঝরানো উপার্জনের নিরাপত্তার স্বার্থেই তারা অবিলম্বে বর্তমান চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবি করছেন।
গ্রাহকদের স্পষ্ট দাবি, ইসলামী ব্যাংকের মতো একটি স্পর্শকাতর ও বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের হাল ধরতে হবে এমন কাউকে, যার ইসলামি অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। একইসঙ্গে সর্বস্তরের মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা থাকাটাও জরুরি। এই রদবদলের পাশাপাশি ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুককে অবিলম্বে তার স্বীয় পদে পুনর্বহাল করার জোর দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
বিক্ষুব্ধ এই জনতা কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবিতেই থেমে নেই, তারা দেশের আর্থিক খাত থেকে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি তুলেছেন। বিশেষ করে এস আলম গোষ্ঠীর (দেশের একটি বৃহৎ শিল্প পরিবার) বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন তারা। গ্রাহকদের এই আস্থার সংকটের নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যেই ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে পড়তে শুরু করেছে। জানা গেছে, তীব্র আতঙ্কের বশবর্তী হয়ে মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে গ্রাহকরা এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রায় তিন হাজার পাঁচশ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন, যা দেশের ব্যাংক খাতের ইতিহাসে এক গভীর উদ্বেগের বিষয়।
এই সংকটের সূত্রপাত ঘটে মূলত পবিত্র ঈদুল আজহার ঠিক আগে। ঈদের ছুটির আগের শেষ কর্মদিবসে আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করেন ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান, যিনি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনোনীত স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এই পদত্যাগের রেশ কাটতে না কাটতেই ওইদিন রাতেই তড়িঘড়ি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক উপ-গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই আকস্মিক নিয়োগ প্রক্রিয়াই মূলত সাধারণ গ্রাহকদের মনে সন্দেহের বীজ বপন করে।
নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পর থেকেই ঈদের ছুটির মধ্যেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন গ্রাহকরা। সম্প্রতি এই ফোরামের একটি শান্তিপ্রিয় সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, পুলিশ তাদের ওপর অতর্কিত লাঠিচার্জ করে এবং তাদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান (তীব্র বেগে পানি ছোঁড়ার যন্ত্র) ও শব্দবোমা নিক্ষেপ করে। এই হামলায় অন্তত পঁচিশজন সাধারণ গ্রাহক আহত হয়েছেন বলে সচেতন গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
এত বাধা বিপত্তি ও পুলিশের কঠোর অবস্থানের পরও বিন্দুমাত্র পিছপা হতে রাজি নন সাধারণ আমানতকারীরা। ফোরামের পক্ষ থেকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে, তাদের আমানতের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বর্তমান চেয়ারম্যানের অপসারণসহ অন্যান্য ন্যায্য দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথের এই ধারাবাহিক অবস্থান কর্মসূচি কোনোভাবেই বন্ধ করা হবে না।
দেশের অন্যতম বৃহৎ একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদ নিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের এমন প্রকাশ্য রাজপথের আন্দোলন পুরো দেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় অশনিসংকেত। সাধারণ মানুষের তিল তিল করে জমানো সঞ্চয়ের নিরাপত্তা যখন প্রশ্নের মুখে পড়ে, তখন কেবল নেতৃত্ব বদলই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন হয় পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। গ্রাহকদের এই প্রবল আস্থার সংকট দূর করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কি দ্রুত ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেবে, নাকি আস্থার এই ফাটল আরও বড় হয়ে পুরো অর্থনীতিকে খাদের কিনারে ঠেলে দেবে—তা আজ দেশের প্রতিটি সাধারণ আমানতকারীর মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।