আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বেতন ও উৎসব ভাতা (বোনাস) ছুটির আগেই পরিশোধ করার কড়া নির্দেশ দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে, মহাসড়কে চাঁদাবাজি ঠেকাতে এবং কোরবানির পশুর হাটের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার (১২ মে) সচিবালয়ে ঈদুল আজহা উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও কোরবানির পশুর হাটের নিরাপত্তা বিষয়ক এক গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ঈদের ছুটিতে পোশাক কারখানার শ্রমিকরা যেন কোনো ধরনের আর্থিক সংকট বা ভোগান্তিতে না পড়েন, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এ জন্য বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), নিটওয়্যার মালিকদের সংগঠন (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ঈদযাত্রায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করতেও বিশেষ পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সড়ক ও নৌপথে দুর্ঘটনা এড়াতে চলাচলের অনুপযোগী বা ত্রুটিপূর্ণ (ফিটনেসবিহীন) যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। পাশাপাশি ঈদযাত্রার আগেই মহাসড়কের খানাখন্দ বা গর্তগুলো দ্রুত সংস্কার করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ফেরিঘাট ও লঞ্চ টার্মিনালে ঘরমুখো যাত্রী এবং কোরবানির পশু পরিবহনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হতে না হয়, সেজন্য বিশেষ নজরদারি ব্যবস্থা মোতায়েন থাকবে।
ঈদের প্রাক্কালে ও ছুটির সময়ে দেশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পুলিশ সদরদপ্তরে একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (মনিটরিং সেল) গঠন করা হয়েছে। এই কেন্দ্রটি ঈদের আগের সাত দিন এবং পরের সাত দিন সার্বক্ষণিক কাজ করবে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার এবং কোস্টগার্ডসহ সব গোয়েন্দা সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেকোনো ধরনের জরুরি প্রয়োজনে সাধারণ মানুষ যেন দ্রুত সহায়তা পায়, সেজন্য ফায়ার সার্ভিস (১০২) এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআইডব্লিউটিএ (১৬১১৩)-সহ জরুরি সেবা নম্বরগুলো সার্বক্ষণিক চালু থাকবে।
কোরবানির পশুর হাটের প্রস্তুতি সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এবার সারাদেশে মোট চার হাজার ২৫৯টি পশুর হাট বসানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৫টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টি হাট বসবে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তায় প্রতিটি হাটে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং সার্বক্ষণিক নজরদারি ক্যামেরা (সিসিটিভি) স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাল টাকা শনাক্ত করতে হাটে হাটে ব্যাংকের অস্থায়ী কেন্দ্র (বুথ) এবং বিশেষ যন্ত্র থাকবে। ইজারাদাররা চাইলে নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্যদেরও নিয়োগ দিতে পারবেন।
পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি ঠেকাতে এবার চরম কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, চাঁদাবাজি বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা শরীরে যুক্ত বিশেষ ক্যামেরা ব্যবহার করবেন। পাশাপাশি সাধারণ পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হবে। কোরবানির পশুর চামড়া যেন কোনোভাবেই দেশের বাইরে পাচার হতে না পারে, সেজন্য সীমান্তে বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
চামড়ার গুণগত মান ঠিক রাখতে কোরবানি করার দুই ঘণ্টার মধ্যেই লবণ দিয়ে সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হবে। প্রান্তিক পর্যায়ে লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিনামূল্যে লবণ বিতরণের একটি বিশেষ উদ্যোগ অনুমোদন করেছেন বলেও মন্ত্রী জানান।
সভায় ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ঈদের আগে পোশাক শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং চাঁদাবাজি রোধে সরকারের এই বহুমুখী উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। প্রতি বছরই ঈদের সময় ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি, মহাসড়কে পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি এবং পশুর হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তাহীনতা একটি সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে। সরকারের দেওয়া এই কঠোর নির্দেশনাগুলো কেবল কাগজ বা সভাকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি মাঠপর্যায়ে এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত হবে—তার ওপরই নির্ভর করছে সাধারণ মানুষের একটি স্বস্তিদায়ক ঈদ উদযাপন। বিশেষ করে, পোশাকে ক্যামেরা ব্যবহার ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে চাঁদাবাজি প্রতিরোধের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তার সফল বাস্তবায়ন হলে তা আগামী দিনের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।