পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশের বাজারে সোনার দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম ২ হাজার ১৫৮ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ৩৮ হাজার ১২১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সোমবার থেকে কার্যকর হওয়া এই সিদ্ধান্ত উৎসবের কেনাকাটায় সাধারণ ক্রেতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার সকালে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মূল্য বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সোমবার সকাল ১০টা থেকেই নতুন এই মূল্য তালিকা সারা দেশে কার্যকর করা হয়েছে। বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির এক জরুরি সভায় দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও কাঁচামালের বাজার দর বিশ্লেষণ করে এই মূল্য পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দেশের বাজারে সাধারণত সোনার চাহিদা যখন বৃদ্ধি পায়, তখন সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিলে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হয় বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) সোনার দাম ২ হাজার ১৫৮ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ৩৮ হাজার ১২১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বাইরে অন্যান্য মানের সোনার দামও আনুপাতিক হারে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ২১ ক্যারেট এবং ১৮ ক্যারেটের সোনার দামেও পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের সাধ ও সাধ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। তবে এই নতুন মূল্যের সাথে ক্রেতাদের সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং অলংকারের আধুনিক ডিজাইন বা নকশা অনুযায়ী অতিরিক্ত মজুরি পরিশোধ করতে হবে। ফলে চূড়ান্ত পর্যায়ে একজন ক্রেতাকে অলংকার ক্রয়ের জন্য ভরিপ্রতি আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে।
সোনার দাম বাড়ার পাশাপাশি রূপার দামেও কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাজুস জানিয়েছে, পরবর্তী সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এই নতুন দাম কার্যকর থাকবে। রূপা সাধারণত স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য অলংকার তৈরির অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ফলে রূপার মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টিও বাজারে গভীর প্রভাব ফেলে। জুয়েলারি খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান ধাতুর অবমূল্যায়ন এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোতে সোনার মজুদ বাড়ানোর প্রবণতার কারণে বিশ্বজুড়েই এই মূল্যবান ধাতুর দাম বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে।
পবিত্র ঈডের ঠিক আগে এই দাম বৃদ্ধি মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের কেনাকাটার পরিকল্পনায় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। ঈদ উৎসবের সময়ে অনেকে মেয়ে বা পরিবারের সদস্যদের জন্য উপহার হিসেবে সোনার অলংকার কিনে থাকেন। রাজধানীর বিভিন্ন জুয়েলারি দোকান ঘুরে দেখা গেছে, দাম বাড়ার পর সাধারণ ক্রেতাদের আনাগোনা কিছুটা কমে গেছে। অনেক ক্রেতা জানান, আগে থেকেই বাজেট নির্ধারণ করে রাখায় এখন বাধ্য হয়ে অলংকারের ওজন বা মান কমিয়ে দিতে হচ্ছে। জুয়েলারি মালিকদের একাংশ মনে করছেন, হঠাৎ এই দাম বৃদ্ধিতে উৎসবের মৌসুমে বেচাবিক্রিতে কিছুটা মন্দাভাব দেখা দিতে পারে।
ব্যবসায়ীরা আরও জানান, সাধারণত বিয়ের মৌসুম এবং উৎসবের সময়ে দেশে সোনার বাজারে গতিশীলতা ফিরে আসে। কিন্তু ঘন ঘন মূল্য পরিবর্তনের কারণে সাধারণ ক্রেতারা বিভ্রান্তিতে পড়েন। অনেক সময় ক্রেতারা দাম কমার অপেক্ষায় কেনাকাটা স্থগিত রাখেন, যা খুচরা বিক্রেতাদের দৈনিক বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরে সোনার একটি সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি আমদানি নীতিমালা পুরোপুরি বাস্তবায়নের দাবি তুলেছেন অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। বৈশ্বিক বাজারে দামের ওঠানামার সাথে সাথে দেশীয় বাজারে দ্রুত এর প্রভাব পড়া রোধ করতে অভ্যন্তরীণ মজুদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
সোনার দামের এই ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির উৎসবের আনন্দকে কিছুটা হলেও ম্লান করে দেয়। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে ঘন ঘন দাম পরিবর্তন দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে কেবল আমদানির ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় পর্যায়ে সোনার বাজারের তদারকি বাড়ানো এবং বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় সাধারণ মানুষের জন্য সোনাকে একটি নিরাপদ বিনিয়োগ বা সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে ধরে রাখা ভবিষ্যতে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।