দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকা শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত শিশু নিরাপত্তা টাস্কফোর্স (বিশেষ পর্যবেক্ষণ ও তদারকি দল) গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, শিশুদের সামাজিক ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব এবং কেবল প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নয়, এই ব্যাধি দূর করতে মাঠপর্যায়ে বাস্তবমুখী কাজের ওপরেই এখন সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে।
গতকাল শনিবার (৬ জুন) রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডেপুটি স্পিকার এ আহ্বান জানান। "বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান শিশু নির্যাতন মোকাবিলা: প্রতিবন্ধকতা, দায়িত্ব ও করণীয়" শীর্ষক এই বৈঠকের আয়োজন করে 'নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা সেল'।
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, শিশু নির্যাতন বর্তমান সময়ে একটি গুরুতর সামাজিক ব্যাধি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এটি কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগ দিয়ে চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব নয়। এই ভয়াবহ ব্যাধির হাত থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রের সকল সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে যার যার অবস্থান থেকে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও সতর্ক ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, শিশু নির্যাতনের মূল কারণগুলো সবার আগে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি। সেই সঙ্গে আমাদের বিদ্যমান শিশু সুরক্ষা সংক্রান্ত আইন, প্রাতিষ্ঠানিক নীতি ও সামাজিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে কী কী ঘাটতি রয়েছে, তা নিরূপণ করে দ্রুত যুগোপযোগী সংশোধন আনা প্রয়োজন। শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, মানবিক ও সহিংসতামুক্ত সমাজ বিনির্মাণ করতে হলে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই জাতীয় কৌশল প্রণয়ন করতে হবে।
আলোচনায় সম্প্রতি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী শিশু রামিসা হত্যার বিচার প্রসঙ্গে ডেপুটি স্পিকার অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে এই নির্মম অপরাধের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, সমাজ থেকে অপরাধীদের এই বার্তা স্পষ্ট করে দিতে হবে যে, শিশুদের গায়ে হাত তুললে রেহাই পাওয়ার কোনো পথ নেই।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বর্তমান যুগের নতুন উপদ্রব অনলাইন অপরাধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, বর্তমান সময়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের সমান্তরালে অনলাইনভিত্তিক বা সাইবার অপরাধের (ইন্টারনেট বা ডিজিটাল মাধ্যমে হেনস্তা ও ব্ল্যাকমেইল করা) ঝুঁকি উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা ঘরে বসেও ইন্টারনেটের মাধ্যমে নানা ধরনের সাইবার বুলিং ও ব্ল্যাকমেইলের শিকার হচ্ছে। এই বড় সংকট কাটাতে হলে অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কঠোর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং সামগ্রিকভাবে শিশু অধিকার সম্পর্কে ব্যাপক সামাজিক গণসচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের উদ্ধার, পুনর্বাসন, আইনি সহায়তা ও চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী বিভিন্ন অলাভজনক সামাজিক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মানবিক ভূমিকার প্রশংসাও করেন ডেপুটি স্পিকার। তিনি বলেন, সরকারের পাশাপাশি এসব বেসরকারি উদ্যোগ ভুক্তভোগীদের মানসিক ট্রমা (অতিরিক্ত মানসিক আঘাত ও ভীতি) কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে এবং তাদের আইনি অধিকার আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এই সহযোগী সংস্থাগুলোকে কাজের অনুকূল পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা।
'নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা সেল'-এর কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলামের চমৎকার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মিজ ফারজানা শারমীন। এছাড়া অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, প্রখ্যাত অভিনেতা আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল, নিহত রামিসার শোকাতুর বাবা, দেশের শীর্ষস্থানীয় নারী ও শিশু অধিকার বিষয়ক সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ, বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মানবাধিকার কর্মী এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
আমাদের দেশে শিশুদের সুরক্ষায় চমৎকার সব আইন থাকলেও তার সঠিক ও সময়মতো প্রয়োগ না হওয়ার কারণে প্রায়ই অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। ডেপুটি স্পিকারের প্রস্তাবিত সমন্বিত শিশু নিরাপত্তা টাস্কফোর্স যদি সত্যি গঠন করা যায় এবং সেটি যদি কোনো রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ছাড়াই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তবে তা দেশের শিশু সুরক্ষায় একটি বড় মাইলফলক হবে। তবে আইন বা টাস্কফোর্স গঠনের চেয়েও বড় বিষয় হলো আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্বের পরিবর্তন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটানো। রামিসার মতো আর কোনো নিষ্পাপ শিশুকে যাতে অকালে ঝরে যেতে না হয়, তার জন্য আমাদের বিচার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক করাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।