বিয়ের দীর্ঘ সময় পর দেনমোহর পরিশোধের ক্ষেত্রে টাকার অবমূল্যায়ন এবং মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করে একটি সমন্বিত নীতিমালা জারির নির্দেশনা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট আবেদন করা হয়েছে। রোববার (৫ জুলাই) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাহমিদা আখতার ‘জনস্বার্থে’ এই আবেদনটি দায়ের করেন।
রিট আবেদনে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ১০ ধারার অধীনে একটি পূর্ণাঙ্গ ও যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের আরজি জানানো হয়েছে। যার মূল উদ্দেশ্য হবে— বিয়ের দীর্ঘ সময় বা কয়েক দশক পার হওয়ার পর দেনমোহর আদায়ের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ও টাকার বর্তমান অবমূল্যায়ন বিবেচনা করে একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি, নীতি এবং মূল্যায়ন কাঠামো নির্ধারণ করা।
আবেদনে সংবিধানের ৭, ২৭, ২৮ ও ৩১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত নাগরিকদের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এই রিট আবেদনে বিবাদী করা হয়েছে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব (আইন ও বিচার বিভাগ এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ), মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বাংলাদেশ আইন কমিশনের চেয়ারম্যানকে।
আবেদনকারী আইনজীবী ফাহমিদা আখতার বলেন, "ইসলামী শরিয়াহ ও দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী দেনমোহর হচ্ছে স্ত্রীর একটি অবিচ্ছেদ্য বৈবাহিক অধিকার এবং স্বামী তা পরিশোধ করতে আইনত বাধ্য। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের সমাজে দেনমোহর ফাঁকি দেওয়ার বা দীর্ঘ সময় ঝুলিয়ে রাখার একটি অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।"
তিনি ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ১০ ধারার প্রসঙ্গ টেনে উল্লেখ করেন, কাবিননামায় যদি কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম উল্লেখ না থাকে, তবে সম্পূর্ণ দেনমোহরই ‘প্রম্পট’ বা আশু (যা স্ত্রী চাওয়া মাত্র পরিশোধযোগ্য) হিসেবে ধরে নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে বিয়েতে গহনা বা পোশাক বাবদ কিছু অর্থ ‘উসুল’ দেখিয়ে বাকি অংশ বিলম্বিত রাখা হয়। স্ত্রী লোকলজ্জার ভয়ে কিংবা সুখে সংসার করার স্বার্থে বৈবাহিক জীবনে এই অর্থ দাবি করেন না। বিষয়টি মূলত সামনে আসে বিবাহবিচ্ছেদ বা ডিভোর্সের পর।
মূল্যস্ফীতির কারণে দেনমোহরের অবমূল্যায়নের একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে এই আইনজীবী বলেন, "ধরা যাক, ২০ বছর আগে কারও বিয়েতে দেনমোহর ২ লাখ টাকা ধার্য করা হয়েছিল। তখন ১ লাখ টাকা উসুল দেখিয়ে বাকি ১ লাখ টাকা বিলম্বিত রাখা হয়। এখন ২০ বছর পর বিবাহবিচ্ছেদের সময় সেই ২০ বছর আগের ১ লাখ টাকাই দেনমোহর হিসেবে পরিশোধ করা হচ্ছে। এর সাথে তিন মাসের ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ দিয়ে পুরো বিষয়টি মীমাংসা করা হয়, যা কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না। এই দীর্ঘ ২০ বছরে ওই নারীর দেওয়া পারিবারিক শ্রম ও ত্যাগের যেমন মূল্যায়ন করা হয় না, তেমনি ২০ বছর আগের ১ লাখ টাকার ক্রয়ক্ষমতা আর বর্তমানের ১ লাখ টাকা কোনোভাবেই সমান নয়।"
তিনি মনে করেন, টাকার মান কমে যাওয়ার কারণে বৈবাহিক জীবনে নারীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে মূল আইনি উদ্দেশ্য ছিল, তা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করা সম্ভব হলে তা স্বামীদের ‘আশু দেনমোহর’ তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করতে উৎসাহিত করবে। কারণ বিলম্বিত দেনমোহর পরবর্তীতে দিতে গেলে টাকার মূল্যমানের সমন্বয়ের কারণে অঙ্কের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে। এতে বৈবাহিক সম্পর্কে নারীর অধিকার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ডিভোর্সের পর দেনমোহর আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতগুলোতে যে হাজার হাজার মামলার জটলা তৈরি হয়, তা বহুলাংশে কমে যাবে।
স্ত্রী নিজে থেকে চলে গেলে বা বিবাহবিচ্ছেদের উদ্যোগ নিলে দেনমোহর মওকুফ হয়ে যায়— সমাজে প্রচলিত এই ধারণাকে ‘সম্পূর্ণ ভুল’ বলে মন্তব্য করেন এই আইনজীবী। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, স্ত্রী নিজে তালাক দিলে বা সংসার করতে অনিচ্ছুক হয়ে চলে গেলেও স্বামী সম্পূর্ণ দেনমোহর পরিশোধ করতে বাধ্য। কে তালাক দিল বা বিচ্ছেদের কারণ কী— দেনমোহর আদায়ের আইনি অধিকারে তার কোনো প্রভাব পড়ে না।