শিশুদের জীবন রক্ষাকারী হাম ও রুবেলার টিকা সময়মতো আমদানি না করে কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে মহামারি সৃষ্টি এবং শিশু মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলার আবেদন করা হয়েছে। সোমবার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই আবেদনটি জমা দেওয়া হয়।
সোমবার (৮ জুন) ঢাকার এডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (অতিরিক্ত প্রধান মহানগর হাকিম) জশিতা ইসলামের আদালতে কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনের সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল বাদী হয়ে এই মামলার আবেদন করেন। দণ্ডবিধির ৪০৯ (সরকারি কর্মচারী কর্তৃক বিশ্বাসভঙ্গ), ৪২০ (প্রতারণা), ২৭০ (মারাত্মক রোগের সংক্রমণ ছড়ানোর অবহেলা), ৩০৪ (অপরাধমূলক নরহত্যা) ও ৩৪ (যৌথ উদ্দেশ্য) ধারায় মামলাটি দায়েরের আবেদন করা হয়। আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ শেষে এ বিষয়ে পরে আদেশ দেবেন বলে জানিয়েছেন আদালতের বেঞ্চ সহকারী আশুতোষ। মামলা দায়েরের সময় আদালতে বাদীপক্ষের আইনজীবী গোলাম মোস্তফা খান উপস্থিত ছিলেন।
মামলার আবেদনে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম ছাড়াও অন্য যে তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে তারা হলেন— সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সচিব মো. সাইদুর রহমান, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ সায়েদুর রহমান এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর।
আবেদনে বাদী অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে নবজাতক ও শিশুদের সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষায় সরকারি সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হাম ও রুবেলার টিকা নিয়মিত এবং বাধ্যতামূলকভাবে প্রদান করা হয়ে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের শিশু তহবিল বা ইউনিসেফের (বিশ্বের শিশুদের উন্নয়ন ও সুরক্ষায় নিয়োজিত জাতিসংঘের বিশেষ সংস্থা) মাধ্যমে বাংলাদেশে এই টিকা আমদানির একটি সুনির্দিষ্ট ও মসৃণ প্রক্রিয়া চালু ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রচলিত এই জনগুরুত্বপূর্ণ আমদানি প্রক্রিয়াটি আসামিদের নির্দেশে স্থগিত করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির মাধ্যমে টিকা আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় দীর্ঘ দেড় বছর সময়ক্ষেপণ করা হয়, যার ফলে দেশজুড়ে এই টিকার তীব্র সংকট তৈরি হয়।
মামলার আরজিতে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে নিয়োজিত ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স (যিনি এই মামলার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী) গত ২০ মে সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, দেশে হাম ও রুবেলার টিকার সম্ভাব্য সংকট সম্পর্কে তারা স্বাস্থ্য বিভাগকে বেশ কয়েকবার সতর্ক করেছিলেন। এমনকি সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার স্বার্থে নিয়মিত আমদানি প্রক্রিয়া বন্ধ না করার অনুরোধ জানিয়ে আসামিদের দপ্তরে অন্তত ৫ থেকে ৬টি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু অভিযুক্তরা ক্ষমতার অপব্যবহার ও চরম পেশাগত অবহেলা প্রদর্শন করে সেই আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তায় কোনো কর্ণপাত করেননি।
টিকার এই ভয়াবহ সংকটের কারণে দেশের একটি বড় অংশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব মহামারি আকার ধারণ করে। মামলার আবেদনে সরকারি পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে বলা হয়, গত ১৫ মার্চ থেকে ৪ জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ৭৫ হাজার ৭০৮ জন শিশু হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়। যথাসময়ে টিকা না পেয়ে সরকারি হিসাব মতেই সারা দেশে প্রায় ৬১০ জন কোমলমতি শিশুর অকাল ও নির্মম মৃত্যু ঘটে এবং প্রায় ৭৫ হাজার ৭০০ শিশু শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
অভিযোগে নির্দিষ্ট কয়েকটি শিশু মৃত্যুর হৃদয়বিদারক ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। গত ২ জুন চট্টগ্রামের মীরসরাই এলাকার বাসিন্দা হারুনুর রশিদ ও ইশরাত জাহান দম্পতির সন্তান আবদুল্লাহ আল ফাহিম এবং ২২ মে আবদুল্লাহ আল নোমান নামের অপর এক শিশু ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। এছাড়া গত ২২ এপ্রিল জাফরজান ইসলাম ও হেলাল ভূঁইয়া দম্পতির একমাত্র সন্তান ফাইয়াজ হাসান তাজিম রাজধানীর একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
বাদী তার আবেদনে উল্লেখ করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী ও রাষ্ট্রীয় বিশেষ সুবিধাভোগী হওয়ায় প্রথমে রাজধানীর বনানী থানায় মামলা করতে গেলে থানা কর্তৃপক্ষ এজাহার গ্রহণ করতে অপরাগতা প্রকাশ করে এবং আইনগত প্রতিকারের জন্য সরাসরি আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেয়। এরই প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালতে এই নালিশি মামলার আবেদন করা হয়েছে। আবেদনে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে উপযুক্ত শাস্তির প্রার্থনা করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় টিকাদান কর্মসূচি একটি দেশের মৌলিক স্তম্ভের মতো কাজ করে, বিশেষ করে শিশুদের জীবন সুরক্ষায় এর কোনো বিকল্প নেই। টিকার মতো একটি জরুরি জাতীয় স্বাস্থ্য উপাদান আমদানির ক্ষেত্রে যেকোনো ধরণের নীতিগত সিদ্ধান্তহীনতা বা আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা যে কতটা ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তা এই অনাকাঙ্ক্ষিত শিশু মৃত্যুর পরিসংখ্যান ও ঘটনাগুলো থেকে স্পষ্ট। আদালতের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমেই কেবল বেরিয়ে আসবে নীতিগত পরিবর্তনের পেছনে কোনো প্রশাসনিক অবহেলা ছিল কি না। তবে এই ঘটনাটি দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় শিক্ষা যে, জনস্বাস্থ্যের স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে সাধারণ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ঊর্ধ্বে রেখে সর্বদা অগ্রাধিকার দেওয়া আবশ্যক।