ঢাকার রামপুরায় গত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক যুবককে গুলি এবং অন্য দুজনকে হত্যার ঘটনায় ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আদালত)। মামলায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে অন্য দুই পুলিশ সদস্যকে ভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত।
আজ রোববার (২৮ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই রায় ঘোষণা করেন। এই প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন—বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর দুই আসামি হলেন—ডিএমপির খিলগাঁও জোনের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান। এছাড়া রামপুরা থানার সাবেক উপ-পরিদর্শক (এসআই) তরিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মামলাটিতে অভিযুক্ত পাঁচ আসামির মধ্যে একমাত্র চঞ্চল চন্দ্র সরকারই বর্তমানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে তথা কারাগারে আছেন। রায় ঘোষণার পূর্বে তাকে কড়া নিরাপত্তায় ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
মামলার নথি ও ট্রাইব্যুনালের বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রামপুরা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান চলাকালে জুমার নামাজ শেষ করে বাসায় ফিরছিলেন আমির হোসেন নামের এক সাধারণ যুবক। বাসার কাছাকাছি পৌঁছালে তিনি পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যকার তীব্র সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে যান। নিজের জীবন বাঁচাতে আমির হোসেন দৌড়ে পাশের একটি নির্মাণাধীন চারতলা ভবনে আশ্রয় নেন।
সে সময় কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করতে করতে ওই ভবনের চারতলায় উঠে যান। সেখানে আমির হোসেনকে একাকী পেয়ে পুলিশ সদস্যরা তার ওপর চড়াও হন এবং ছাদ থেকে নিচে লাফ দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। তাকে ভয় দেখাতে পুলিশ সদস্যরা আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে ফাঁকা গুলিও ছোড়েন। চরম আতঙ্কে আমির হোসেন ভবনটির চারতলার কার্নিশ বেয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন এবং একটি লোহার রড ধরে ঝুলে থাকেন। এই অসহায় অবস্থায় নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক পুলিশ সদস্য তাকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত নির্মমভাবে পরপর ছয়টি গুলি করেন। গুলিগুলো সরাসরি তার দুই পায়ে বিদ্ধ হয়।
পুলিশ ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পর গুরুতর আহত আমির হোসেন কোনোমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিচে পড়েন। সে সময় তার দুই পা বেয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। পরবর্তীতে স্থানীয় এলাকাবাসী তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান এবং দীর্ঘ চিকিৎসার পর সৌভাগ্যবশত তিনি প্রাণে বেঁচে যান। তবে একই দিনে রামপুরার বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান নাদিম ও মায়া ইসলাম নামের আরও দুই ব্যক্তি।
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর গত বছরের ৩১ জুলাই প্রধান কৌঁসুলির (চিফ প্রসিকিউটর) কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থা। এরপর ৭ আগস্ট আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। ওই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ ও আইনি যুক্তি-তর্ক শেষে আজ আদালত এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করলেন।