বাংলাদেশের সব কর্মজীবী নারীর জন্য সমান মাতৃত্বকালীন অধিকার ও সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টি নিয়ে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছেন উচ্চ আদালত। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের সব কর্মজীবী নারীর জন্য সমান মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা দিতে এবং এ বিষয়ে একটি অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নে সরকারের ব্যর্থতা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে।
সোমবার (২৯ জুন) হাইকোর্টের (উচ্চ আদালত) বিচারপতি ফাহমিদা কাদের এবং বিচারপতি মোহাম্মদ আশিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বিচারিক বেঞ্চ (এজলাস) এই রুল জারি করেন। সুপ্রিম কোর্টের (সর্বোচ্চ আদালত) আইনজীবী ইশরাত হাসানের দায়ের করা এক জনস্বার্থমূলক রিট (উচ্চ আদালতে দায়েরকৃত বিশেষ আবেদন) আবেদনের শুনানি নিয়ে আদালত এই আদেশ দেন। মামলায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও আইন সচিবসহ মোট ১২ জনকে বিবাদী করা হয়েছে।
রুলে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ৪৬(২) ধারা ও ৪৬(১) ধারার শর্তাংশ এবং বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (সরকারি চাকরি বিধিমালা)-এর ১৯৭ নম্বর বিধিকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এই আইন ও বিধিগুলোতে কর্মজীবী নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ও সুযোগ-সুবিধা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমিত করা হয়েছে। বিশেষ করে তৃতীয় বা পরবর্তী সন্তানের ক্ষেত্রে নারীদের এই মাতৃত্বকালীন ছুটি ও আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার নিয়ম রয়েছে। আদালত জানতে চেয়েছেন, এই সীমিত করার বিধান কেন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭, ১৫, ১৮, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩১ ও ৩২-এর পরিপন্থী এবং অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না।
রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা কোনো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ বা রাষ্ট্রীয় অনুদান নয়। এটি মূলত মা ও তার নবজাতক সন্তানের মৌলিক স্বাস্থ্যসুরক্ষা, মানবিক মর্যাদা, সমতা এবং সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একটি প্রগতিশীল রাষ্ট্রে তৃতীয় বা পরবর্তী সন্তানের জন্মের অজুহাতে একজন মাকে তার এই ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা চরম বৈষম্যমূলক এবং সম্পূর্ণ সংবিধানপরিপন্থী।
বর্তমানে সরকারি খাতের নারীরা ছয় মাসের সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি পেলেও বেসরকারি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানে এই ছুটির মেয়াদ মাত্র চার মাস বা তার চেয়েও কম। এমনকি অনেক বেসরকারি কারখানায় বা সংস্থায় এই নিয়মগুলো সঠিকভাবে পালনও করা হয় না। বিশেষ করে পোশাক শিল্প এবং অন্যান্য শ্রমঘন খাতের নারী শ্রমিকেরা তৃতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রসূতি সুবিধা পান না, যা তাদের এবং তাদের শিশুদের স্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। এই বৈষম্য দূর করতে একটি জাতীয় অভিন্ন নীতিমালার দাবি দীর্ঘদিনের।
রিটকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান শুনানিতে বলেন, মাতৃত্ব কোনো শাস্তির বিষয় নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক সুরক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সব কর্মজীবী নারীর বৈষম্যহীন ও সমান অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই আবেদন করা হয়েছে। এই রিট মামলার চূড়ান্ত রায় দেশের নারী অধিকার, কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গসমতা এবং শ্রম খাতের সুরক্ষায় একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে।